লেটুশদার হাতেখড়ি
তৃণাঞ্জয় ভট্টাচার্য
( পর্ব - তিন )
হোটেলে ফিরে ভালোভাবে স্নান সেরে নীচের রেস্টোরেন্ট থেকে সরষেবাটা দিয়ে মাছের ঝোল আর ভাত খেয়ে আমরা বেশ কিছুক্ষন পায়চারি করলাম সমুদ্রের ধারে |
তারপর ফিরে এলাম হোটেলে | একটা ডবল বেডরুমে আমি, লেটুশদা এবং কদমকৃষ্ণবাবু একইসঙ্গে রয়েছি | ঘরের এসিটা চালিয়ে দিয়ে আমরা তিনজনই গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়লাম | গতরাতের ট্রেনের ক্লান্তিতে ঘুমে যেন জড়িয়ে গেল পুরো শরীরটা |
সূর্য ডুবে যাওয়ার পর সমুদ্রের রূপটা সত্যিই অন্যরকম | ভালো তো লাগেই| তবে তার সঙ্গে সঙ্গেই একটা অদ্ভুত গা ছমছমে ভাব কাজ করে | আমরা সমুদ্রের পাড়ের বালিতে বসেই কফি খাচ্ছি আর তাকিয়ে আছি সমুদ্রের দিকে | ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেই ঢেউগুলো প্রায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে | কদমকৃষ্ণবাবু বললেন,
'এইসময় একেবারে চুপ করে থেকে শুধু সমুদ্রের গুঞ্জন শুনতে হয় |'
অর্থাৎ, কেষ্টদাকে কবিত্বে পেয়েছে | তাঁর অদ্ভুত স্থূল চেহারার সঙ্গে লাজুক লাজুক হাসি আর কবিত্বের ব্যাপারটা এতটাই হাস্যকর যে চেপে রাখা মুশকিল | ওনার নিজের পক্ষেই বেশিক্ষন মুখ বন্ধ রাখা সম্ভব নয় | বকবক বন্ধ হলেও চানাচুর, ডালমুট, বিস্কুট একের পর এক চলছে তো চলছেই | চোয়াল বিশ্রাম পাওয়ার কোনো উপায় নেই |
আমরা যদিও কেউই কথা বলছি না | বিস্কুট শেষ হওয়ার পর কদমকৃষ্ণবাবুই কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন | কিন্তু তাঁকে থামতেই হলো | আমরা সকলেই উঠে দাঁড়ালাম | কারণ আমাদের দিকে এগিয়ে এসেছেন উদ্দালক বসু |
'সকালের ঘটনার জন্য আমি খুবই দুঃখিত মিস্টার সেন |' বললেন ভদ্রলোক | এর মধ্যেই উনি শেভ করেছেন | সকালের থেকে অনেকটা ফ্রেশ লাগছে এখন |
'আরে, এটা কোনো ব্যাপারই নয় | আবার যে কোনোদিন বসা যেতে পারে |' কেষ্টদার উৎসাহ এখনও কমেনি |
'নিশ্চই | কাল বিকেলেই আসুন না আমাদের আস্তানায় |' বিগলিতভাবে বললেন উদ্দালক বসু |
'তাছাড়া, পূবালী কিন্তু সত্যিই ভালো গান গায়।'
'তাই বুঝি!' কদমকৃষ্ণবাবু নিজেকে ভীষণ স্মার্ট দেখানোর চেষ্টা করছেন |
'আপনি বোধহয় কোন কারণে খুব আপসেট ছিলেন?' হঠাৎই বলে উঠলো লেটুশদা |
'আপসেট ! কই নাতো ! ওহো সকালের কথা বলছেন? হাহাহা।'
হেসে উঠলেন ভদ্রলোক | তারপরেই গলাটা একটু নামিয়ে নিয়ে বললেন,
'আপসেট নয় মিস্টার সেন| তবে...',
কী যেন একটা কথা চেপে গেলেন উদ্দালক বসু | তারপরেই প্রসঙ্গ বদলে বললেন,
'আসছেন তো কাল? দেখুন, আপনার প্রশ্নের উত্তর পান কিনা |'
বলেই স্বর্গদ্বারের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলেন |
প্রায় অনেকক্ষণ বাদে একটা গোল্ডফ্লেক ধরালো লেটুশদা এবং ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় সমুদ্রের এই ঝোড়ো হাওয়াতেও সিগারেটটা ধরালো দেশলাইয়ের একটা কাঠিতে | আরও কিছুক্ষণ বসে আমরা তিনজনেই উঠলাম | কারণ, রেস্টোরেন্টগুলোয় নাকি রাত হয়ে গেলে আর ভালো খাবার কিছু পাওয়া যায়না | তবে আমরা নিরাশ হলাম না | মুরগির কারি দিয়ে ভাত আর পরে মদনমোহন মিষ্টি আর মিষ্টি পান খেয়ে কদমকৃষ্ণবাবু তো খুব খুশি | হোটেলে ফিরে আমরা সবাই কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লাম |
সকালবেলা ঘুম ভাঙলো লেটুশদার ডাকে | তেমনটাই হওয়ার কথা ছিল | তবে সেটা কাকভোরে | সাড়ে ছটার সময় নয় | আর লেটুশদা ডাকবে বলেছিল সানরাইজ দেখতে যাওয়ার জন্য | কিন্তু ও যেটা বলল, সেটা শুনে আমি এবং কদমকৃষ্ণবাবু দুজনেই লাফিয়ে উঠে পড়লাম বিছানার ওপরে |
-'তাড়াতাড়ি উঠে হাতমুখ ধুয়ে নে | বেরোতে হবে | রিসেপশনের ছেলেটা খবর দিল পুলীন পুরীতে খুন হয়েছে |'
-'কে?' উত্তেজনায় আমার গলা থেকে শব্দটা বোধহয় বেশ জোরেই বেরোলো |
-'সেটা গেলে জানতে পারবো | তবে আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় যা বলছে...', জানলার বাইরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কথাটাকে কেমন যেন মাঝপথে শেষ করে দিল লেটুশদা |
( ক্রমশ )
আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন ঃ

Comments
Post a Comment