Skip to main content

লেটুশদার হাতেখড়ি (পর্ব - তিন)

লেটুশদার হাতেখড়ি 

তৃণাঞ্জয় ভট্টাচার্য 

( পর্ব - তিন ) 



                                                                    
মি একটা কথা পরিষ্কার জানিয়ে দিই | আমি কিন্তু মোটেই তোপসে নই | তপেশ রঞ্জন মিত্র অনেক বেশি স্মার্ট | প্রদোষচন্দ্র মিত্রের স্যাটেলাইট | প্রত্যেক কাজে তার সহযোগী | আমি একেবারেই তা নই | আমি শুধু আমার ডায়েরিতে অভিজ্ঞতা লিখি | কেন জানিনা, লেটুশদা সঙ্গে থাকলে সেই অভিজ্ঞতা গুলোই একেকটা অদ্ভুত অদ্ভুত  গল্প হয়ে ওঠে | সেবার বাঁশদ্রোণী চার্চের পেতনি গুজবের সময়ও আমি ছিলাম নিতান্ত দর্শক | হোমস থেকে শুরু করে পি.সি. মিটার সবারই একাধিক সহযোগী আছে | শার্লকের ক্ষেত্রে যেমন মাইক্রফট এবং ওয়াটসন, তেমনই ফেলুদার কাছে সিধুজ্যাঠা এবং তোপসে | কিন্তু শশাঙ্ক সেন পুরো একা | সম্বল বলতে নিজের চোখ, বিচার করার অসম্ভব সূক্ষ ক্ষমতা আর প্রচন্ড শক্তিশালী মস্তিষ্ক | আর গাইড আর্থার কন্যান ড্যয়াল, সত্যজিৎ এবং শরদিন্দুর ব্যোমকেশ | সত্যি বলতে কী, আমার এই কথাটা মাঝে মাঝেই মনে হয়, সত্যজিতের ফেলুদা বারবার করে বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন, শার্লক হোমস তার গুরু | আমারও তেমনই মনে হয় শশাঙ্ক সেনের গুরু প্রদোষচন্দ্র মিত্র | তাছাড়া, একজন শার্লক যদি একজন ফেলু মিত্তিরকে সৃষ্টি করতে পারেন, তাহলে একজন ফেলু মিত্তিরই বা কেন একজন লেটুশ সেনকে সৃষ্টি করতে পারবে না !


হোটেলে ফিরে ভালোভাবে স্নান সেরে নীচের রেস্টোরেন্ট থেকে সরষেবাটা দিয়ে মাছের ঝোল আর ভাত খেয়ে আমরা বেশ কিছুক্ষন পায়চারি করলাম সমুদ্রের ধারে |
তারপর ফিরে এলাম হোটেলে | একটা ডবল বেডরুমে আমি, লেটুশদা এবং কদমকৃষ্ণবাবু একইসঙ্গে রয়েছি | ঘরের এসিটা চালিয়ে দিয়ে আমরা তিনজনই গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়লাম | গতরাতের ট্রেনের ক্লান্তিতে ঘুমে যেন জড়িয়ে গেল পুরো শরীরটা |

সূর্য ডুবে যাওয়ার পর সমুদ্রের রূপটা সত্যিই অন্যরকম | ভালো তো লাগেই| তবে তার সঙ্গে সঙ্গেই একটা অদ্ভুত গা ছমছমে ভাব কাজ করে | আমরা সমুদ্রের পাড়ের বালিতে বসেই কফি খাচ্ছি আর তাকিয়ে আছি সমুদ্রের দিকে | ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেই ঢেউগুলো প্রায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে | কদমকৃষ্ণবাবু বললেন,
'এইসময় একেবারে চুপ করে থেকে শুধু সমুদ্রের গুঞ্জন শুনতে হয় |'
অর্থাৎ, কেষ্টদাকে কবিত্বে পেয়েছে | তাঁর অদ্ভুত স্থূল চেহারার সঙ্গে লাজুক লাজুক হাসি আর কবিত্বের ব্যাপারটা এতটাই হাস্যকর যে চেপে রাখা মুশকিল |  ওনার নিজের পক্ষেই বেশিক্ষন মুখ বন্ধ রাখা সম্ভব নয় | বকবক বন্ধ হলেও চানাচুর, ডালমুট, বিস্কুট একের পর এক চলছে তো চলছেই | চোয়াল বিশ্রাম পাওয়ার কোনো উপায় নেই |

আমরা যদিও কেউই কথা বলছি না | বিস্কুট শেষ হওয়ার পর কদমকৃষ্ণবাবুই কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন | কিন্তু তাঁকে থামতেই হলো | আমরা সকলেই উঠে দাঁড়ালাম | কারণ আমাদের দিকে এগিয়ে এসেছেন উদ্দালক বসু |
'সকালের ঘটনার জন্য আমি খুবই দুঃখিত মিস্টার সেন |' বললেন ভদ্রলোক | এর মধ্যেই উনি শেভ করেছেন | সকালের থেকে অনেকটা ফ্রেশ লাগছে এখন |
'আরে, এটা কোনো ব্যাপারই নয় | আবার যে কোনোদিন বসা যেতে পারে |' কেষ্টদার উৎসাহ এখনও কমেনি |
'নিশ্চই | কাল বিকেলেই আসুন না আমাদের আস্তানায় |' বিগলিতভাবে বললেন উদ্দালক বসু |
'তাছাড়া, পূবালী কিন্তু সত্যিই ভালো গান গায়।'
'তাই বুঝি!' কদমকৃষ্ণবাবু নিজেকে ভীষণ স্মার্ট দেখানোর চেষ্টা করছেন |
'আপনি বোধহয় কোন কারণে খুব আপসেট ছিলেন?' হঠাৎই বলে উঠলো লেটুশদা |
 'আপসেট !  কই নাতো ! ওহো সকালের কথা বলছেন? হাহাহা।'
হেসে উঠলেন ভদ্রলোক | তারপরেই গলাটা একটু নামিয়ে নিয়ে বললেন,
'আপসেট নয় মিস্টার সেন| তবে...',
 কী যেন একটা কথা চেপে গেলেন উদ্দালক বসু | তারপরেই প্রসঙ্গ বদলে বললেন,
'আসছেন তো কাল?  দেখুন, আপনার প্রশ্নের উত্তর পান কিনা |'
বলেই স্বর্গদ্বারের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলেন |

প্রায় অনেকক্ষণ বাদে একটা গোল্ডফ্লেক ধরালো লেটুশদা এবং ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় সমুদ্রের এই ঝোড়ো হাওয়াতেও সিগারেটটা ধরালো দেশলাইয়ের একটা কাঠিতে | আরও কিছুক্ষণ বসে আমরা তিনজনেই উঠলাম | কারণ, রেস্টোরেন্টগুলোয় নাকি রাত হয়ে গেলে আর ভালো খাবার কিছু পাওয়া যায়না | তবে আমরা নিরাশ হলাম না | মুরগির কারি দিয়ে ভাত আর পরে মদনমোহন মিষ্টি আর মিষ্টি পান খেয়ে কদমকৃষ্ণবাবু তো খুব খুশি | হোটেলে ফিরে আমরা সবাই কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লাম |


সকালবেলা ঘুম ভাঙলো লেটুশদার ডাকে | তেমনটাই হওয়ার কথা ছিল | তবে সেটা কাকভোরে | সাড়ে ছটার সময় নয় | আর লেটুশদা ডাকবে বলেছিল সানরাইজ দেখতে যাওয়ার জন্য | কিন্তু ও যেটা বলল, সেটা শুনে আমি এবং কদমকৃষ্ণবাবু দুজনেই লাফিয়ে উঠে পড়লাম বিছানার ওপরে |
-'তাড়াতাড়ি উঠে হাতমুখ ধুয়ে নে | বেরোতে হবে | রিসেপশনের ছেলেটা খবর দিল পুলীন পুরীতে খুন হয়েছে |'
-'কে?' উত্তেজনায় আমার গলা থেকে শব্দটা বোধহয় বেশ জোরেই বেরোলো |
-'সেটা গেলে জানতে পারবো | তবে আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় যা বলছে...', জানলার বাইরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কথাটাকে কেমন যেন মাঝপথে শেষ করে দিল লেটুশদা |

                                                                           
( ক্রমশ )

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন ঃ

Comments

Popular posts from this blog

আমার বাবা - আমার ছেলেবেলা

                                            দেখতে দেখতে তেইশটা বছর পেরিয়ে গেল – বাবাকে দেখিনি, গল্প করিনি, বাবার আদরের ছোঁয়া পাইনি…… বাবার কথা বলতে গিয়েই প্রথমে মনে পড়ে তাঁর মিষ্টি হাসিটা। আমার বাবা ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। আমার কখনো মনে পড়েনা যে বাবা আমাকে জোর গলায় কিছু বলেছেন বা বকেছেন। ছোটবেলায় আমি আর আমার বোন সঞ্চারী বাবার কাজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতাম – কেন না বাবা ফিরে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ভূতের গল্প শোনাবেন সেই আশায়! কী যে মজার দিন ছিল সেই সব... ছোটবেলায় আমার শখ ছিল পুতুল নিয়ে খেলার, খুব ভালবাসতাম। মনে পড়ে একবার বাবা আর মা বিদেশ থেকে ফেরার  সময় একটা Walkie Talkie Doll (পুতুল) নিয়ে এসেছিলেন। আমি  সেই পুতুলটিকে নিয়ে সারাদিন খেলতাম। একদিন একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে এসেছিল আমাদের বাড়িতে তার বাবামায়ের সাথে আর ওর –ও ঐ পুতুলটিকে খুব ভালো লেগে গেল। আমার নরম মনের বাবা আমাকে বললেন ‘মানা তুমি ওই বাচ্চাটিকে তোমার এই পুতুলটি দিয়ে দাও, আমি তোমাকে আবার...

আমরা তো হেমন্তই হতে চাইতাম

আজও বিকেলে মাঝে মাঝে খুব হেমন্ত শুনতে ইচ্ছে হয়..... "কোনোদিন বলাকারা এতো দূরে যেত কি "...... কিংবা "ওলির কথা শুনে বকুল হাসে ".......আজও মনে পরে "বিষ্ণুপ্রিয়া গো আমি চলে যাই ".......বা "সারাটি দিন ধরে / চেয়ে আছিস ওরে /তোর মনে কথা তবুও কেউ জানলো  না"......আকাশে মেঘ করলেই মনে পরে "মেঘের স্বপন দেখি "......শুধু একজনের জন্য।...... হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । কখনো আবার বেশি রাতে আজও  শুনি বিবিধ ভারতীতে.... "তেরি দুনিয়া মে জিনিসে /তো বেহতর হ্যায় / কে মর যায়ে ".....আর সাথে যদি হয় 'ছুঁপালো যুঁ দিল মে প্যার মেরা " ...তাহলে তো কথাই নেই।   বাবাদের ছেলেবেলায় খুব প্রিয় ছিল " শূর্পনখার নাক কাটা যায় / উই কাটে বই চমত্কার / খদ্দের কে জ্যান্ত ধরে / গলা কাটে দোকানদার "........ মা এখনও  শুনতে চায় "ঘুম যায় ওই চাঁদ মেঘ পরীদের সাথে "......জ্যাঠার ঘরে বসে কত দুপুর কেটেছে শুধু "বসে আছি পথ চেয়ে"........ সেই কোন ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি "যদি জানতে চাও তুমি / এব্যাথা আমার কত টুকু / তবে বন্দি করা কোনো পাখির কাছে জেনে ...

একই সুরে কত গান

বিষয়টা খুব একটা নতুন নয়।  যদিও বেশ আকর্ষণীয়।  গান আমরা প্রায় সকলেই শুনি।  এবং এও জানি যে এমন গান আছে যা শুনলে হঠাৎ করে মনে হয় "আরে   এই গানটার  একটা হিন্দি আছে না?" বা " এই গানটার বাংলা টা  যেন কি?"  এবং এই গানগুলির বিষয়ে মানুষের এক-ধরণের স্বভাবজাত আকর্ষণ ও আছে।  তাই ভাবলাম দেখি কিছু লেখা যায় কিনা।  মজার ব্যাপার সব গান নিয়ে লেখা খুব একটা সহজ নয়।  তবুও চেষ্টা করে দেখতে গেলে ক্ষতি কি।     প্রথমেই আসা যাক সলিল চৌধুরীর গান -এ।  তিনিই এই কাজ প্রথম শুরু করেন বলেই মনে হয়।  না ভুল হলো তার আগে শচীন কর্তাও আছেন।  তবে আগে সলিল চৌধুরীকে  নিয়েই হোক।  লতাজিকে দিয়ে তিনি ৩৫টি বাংলা  আধুনিক  গান গাইয়ে  ছিলেন।  যার ২৯ খানারই অন্য ভার্সন আছে।  ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " গানটির  হিন্দি  ছিল ১৯৬১ সালে প্রকাশিত "মায়া" হিন্দি ছবির " যারে যারে উড় যারে পঞ্চী " . "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " এর উল্টো দিকে ছিল " না যেও না" যার হিন্দি ছিল ১৯৬০ সালে...