Skip to main content

ঈশ্বরের কন্ঠ





আমি তখন বেশ ছোট, আট-ন'বছর বয়স হবে,  আমার দুই দিদিকে দেখতাম সব সময় গান শুনতো। তখনকার দিনে বই আর গান ছাড়া বিশেষ কিছু করণীয়ও তো ছিল না। তো সেই খেলনাবাটির দিনেই লক্ষ্য করতাম দুজনে সারাক্ষণ টেপ রেকর্ডার-এ গান শুনছে। কার গান? বড়জন সারাক্ষণ হেমন্ত মুখার্জিতে মগ্ন, বেশীটাই রবীন্দ্রসঙ্গীত, এছাড়া বাংলা স্বর্ণযুগের গান। আর মেজদি সারাক্ষণ কিশোরকুমারে ডুবে থাকতো। সে এমন গান শোনা যে বাড়িশুদ্ধু লোককে বুঝিয়ে ছাড়বে কিশোরকুমারের মাহাত্ম্য। আমি বরাবরই স্বাতন্ত্রে বিশ্বাসী। এদের সঙ্গে এসব গান তো শুনতামই, কিন্তু সেই মনকে ছুঁয়ে যাওয়া ব্যাপারটা কখনোই হয়ে ওঠেনি। কোন শিল্পীকেই বিন্দুমাত্র অসম্মান করছি না, আমি নিজেও উপরোক্ত দুই শিল্পীর প্রচুর গান এখনো শুনি। কিন্তু ওই হয় না, যাকে যেটা appeal করে। তো সেই অভিযোগ নিয়ে একদিন বাবার কাছে গেলাম, 'আমি কার গান শুনবো তাহলে?' বাবা ভেবেচিন্তে বললো, 'আমি ক্যাসেট কিনে আনছি, তুই শুনে দেখ।' বাবা মান্না দে, মুকেশ আর মহম্মদ রফির ক্যাসেট কিনে আনলো। শুনলাম, ভালো লাগলো সবই, কিন্তু এই শেষের লোকটির গান যেন আমাকে অন্য এক দুনিয়ায় নিয়ে গেল। প্রথম ক্যাসেটের গানগুলো এখনো মনে আছে, "আজ কি রাত মেরে দিলকি সালামী লে লে', 'হমদম মেরে মান ভি যাও', 'তেরি আঁখো কে সিভা দুনিয়া মে রাখখা ক্যা হ্যায়!' , 'না কিসিকি আঁখ কা নূর হুঁ', 'জব প্যার কিসিসে হোতা হ্যায়', সব গানের কথাও বুঝলাম না, কিন্তু তবু গানগুলো কোথায় যেন গিয়ে ধাক্কা দিলো। আর ক্যাসেটের ওপর দুহাত জড়ো করে সামনে রাখা একটা ভীষন ভালো মানুষের হাসিমুখের ছবি, যেটা শুধু ভরসা যোগায়। তারপর...ডুবে গেলাম রফিতে। একটার পর একটা ক্যাসেট, একটার পর একটা গান খাতায় লেখা, এক একটা গান পনেরোবার কুড়িবার করে শোনা, কণ্ঠস্থ না হওয়া অবধি গেয়ে যাওয়া...রফি আমাকে নতুন দুনিয়ায় নিয়ে গেলেন, সুরের দুনিয়ায়, ভালো লাগার দুনিয়ায়। এমন সব গান যা আনন্দে উচ্ছল হয়ে গাওয়া যায়, ভালবাসায় পাগল হয়ে গাওয়া যায়, আবার দুঃখে হতাশায় ডুবে গিয়েও যে গান আমাকে মানসিক শান্তি যোগায়। সেই গান গেয়ে গেছেন এই সদাহাস্যময় মানুষটি। আমার এক জীবনের সঙ্গীত বোধের সমস্ত ভাল লাগা,মুগ্ধতা, বিস্ময় শুধু এই মানুষটির গান ঘিরে এসেছে। একজন গায়ক কিভাবে এতজন অভিনেতার গলায় এত নিখুঁতভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারেন! রক এন্ড রোল গাইতে তিনি যেমন অপ্রতিরোধ্য তেমনই মজার গান গেয়ে দিচ্ছেন কি অনায়াসে! জীবনে কখনো মদ স্পর্শ করেননি যিনি তিনি কিভাবে 'হ্যায় দুনিয়া উসিকি জমানা উসিকা' গাইতে পারেন! সেই লোকটাই আবার যখন গজল গাইছেন তিনি সম্পূর্ণ অন্য জগতে নিয়ে যান, আর আধ্যাত্মিক গান, 'ও দুনিয়া কে রাখওয়ালে', 'মন তরপত হরি দর্শন কো আজ', 'দুনিয়া না ভায়ে মোহে'...স্বয়ং ঈশ্বরকেও হয়তো কাঁদিয়ে দেয়। আমার সঙ্গীতের সেই আশ্রয়, যার গলায় স্বয়ং ঈশ্বর বিরাজ করেন, সেই মহম্মদ রফি, কোন  সুদূর ১৯৮০ তে সকলকে কাঁদিয়ে চিরতরে বিদায় নিয়েও শ্রোতা ও সমঝদারের হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে অমর হয়ে থাকবেন।

                                            ~ স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক

Comments

  1. অসাধারণ অসাধারণ!!! মর্মস্পর্শী রচনা

    ReplyDelete
  2. অনবদ্য 👌👌👌

    ReplyDelete
  3. Onoboddyo lekha !! Nijeo Rafi bhokto howay aro sporsho korlo lekhata

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

আমার বাবা - আমার ছেলেবেলা

                                            দেখতে দেখতে তেইশটা বছর পেরিয়ে গেল – বাবাকে দেখিনি, গল্প করিনি, বাবার আদরের ছোঁয়া পাইনি…… বাবার কথা বলতে গিয়েই প্রথমে মনে পড়ে তাঁর মিষ্টি হাসিটা। আমার বাবা ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। আমার কখনো মনে পড়েনা যে বাবা আমাকে জোর গলায় কিছু বলেছেন বা বকেছেন। ছোটবেলায় আমি আর আমার বোন সঞ্চারী বাবার কাজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতাম – কেন না বাবা ফিরে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ভূতের গল্প শোনাবেন সেই আশায়! কী যে মজার দিন ছিল সেই সব... ছোটবেলায় আমার শখ ছিল পুতুল নিয়ে খেলার, খুব ভালবাসতাম। মনে পড়ে একবার বাবা আর মা বিদেশ থেকে ফেরার  সময় একটা Walkie Talkie Doll (পুতুল) নিয়ে এসেছিলেন। আমি  সেই পুতুলটিকে নিয়ে সারাদিন খেলতাম। একদিন একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে এসেছিল আমাদের বাড়িতে তার বাবামায়ের সাথে আর ওর –ও ঐ পুতুলটিকে খুব ভালো লেগে গেল। আমার নরম মনের বাবা আমাকে বললেন ‘মানা তুমি ওই বাচ্চাটিকে তোমার এই পুতুলটি দিয়ে দাও, আমি তোমাকে আবার...

আমরা তো হেমন্তই হতে চাইতাম

আজও বিকেলে মাঝে মাঝে খুব হেমন্ত শুনতে ইচ্ছে হয়..... "কোনোদিন বলাকারা এতো দূরে যেত কি "...... কিংবা "ওলির কথা শুনে বকুল হাসে ".......আজও মনে পরে "বিষ্ণুপ্রিয়া গো আমি চলে যাই ".......বা "সারাটি দিন ধরে / চেয়ে আছিস ওরে /তোর মনে কথা তবুও কেউ জানলো  না"......আকাশে মেঘ করলেই মনে পরে "মেঘের স্বপন দেখি "......শুধু একজনের জন্য।...... হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । কখনো আবার বেশি রাতে আজও  শুনি বিবিধ ভারতীতে.... "তেরি দুনিয়া মে জিনিসে /তো বেহতর হ্যায় / কে মর যায়ে ".....আর সাথে যদি হয় 'ছুঁপালো যুঁ দিল মে প্যার মেরা " ...তাহলে তো কথাই নেই।   বাবাদের ছেলেবেলায় খুব প্রিয় ছিল " শূর্পনখার নাক কাটা যায় / উই কাটে বই চমত্কার / খদ্দের কে জ্যান্ত ধরে / গলা কাটে দোকানদার "........ মা এখনও  শুনতে চায় "ঘুম যায় ওই চাঁদ মেঘ পরীদের সাথে "......জ্যাঠার ঘরে বসে কত দুপুর কেটেছে শুধু "বসে আছি পথ চেয়ে"........ সেই কোন ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি "যদি জানতে চাও তুমি / এব্যাথা আমার কত টুকু / তবে বন্দি করা কোনো পাখির কাছে জেনে ...

একই সুরে কত গান

বিষয়টা খুব একটা নতুন নয়।  যদিও বেশ আকর্ষণীয়।  গান আমরা প্রায় সকলেই শুনি।  এবং এও জানি যে এমন গান আছে যা শুনলে হঠাৎ করে মনে হয় "আরে   এই গানটার  একটা হিন্দি আছে না?" বা " এই গানটার বাংলা টা  যেন কি?"  এবং এই গানগুলির বিষয়ে মানুষের এক-ধরণের স্বভাবজাত আকর্ষণ ও আছে।  তাই ভাবলাম দেখি কিছু লেখা যায় কিনা।  মজার ব্যাপার সব গান নিয়ে লেখা খুব একটা সহজ নয়।  তবুও চেষ্টা করে দেখতে গেলে ক্ষতি কি।     প্রথমেই আসা যাক সলিল চৌধুরীর গান -এ।  তিনিই এই কাজ প্রথম শুরু করেন বলেই মনে হয়।  না ভুল হলো তার আগে শচীন কর্তাও আছেন।  তবে আগে সলিল চৌধুরীকে  নিয়েই হোক।  লতাজিকে দিয়ে তিনি ৩৫টি বাংলা  আধুনিক  গান গাইয়ে  ছিলেন।  যার ২৯ খানারই অন্য ভার্সন আছে।  ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " গানটির  হিন্দি  ছিল ১৯৬১ সালে প্রকাশিত "মায়া" হিন্দি ছবির " যারে যারে উড় যারে পঞ্চী " . "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " এর উল্টো দিকে ছিল " না যেও না" যার হিন্দি ছিল ১৯৬০ সালে...