লেটুশদার হাতেখড়ি
তৃণাঞ্জয় ভট্টাচাৰ্য
(শেষ পর্ব)
'বাধ সাধল পুলিশের দেওয়া পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট আর নিমাইয়ের শোনা পূবালী সোমের চিৎকারের সময়ের ডিফারেন্স। এ ব্যাপারে আমার চোখ খুলে দেন আমার বন্ধু কদমকৃষ্ণ হালদার।' একটু দম নেওয়ার জন্য বোধহয় লেটুশদা থামল। একটা গোল্ড ফ্লেক ধরাল। ওর কথা ছাড়া ঘরে আর কোনও শব্দ নেই। যেটা আছে, সেটা বাইরে ঢেউ ভাঙার শব্দ। লেটুশদা আবার শুরু করল –
'এবারে আসি নিমাই যা শুনতে পেয়েছিল সেই কথায়। প্রথমে পূবালিদেবীর গুনগুন গান। তারপরেই আর্তনাদ। অর্থাৎ, কাউকে দেখে চমকে যাওয়ার কোনও শব্দ নেই। অপরিচিত কোনও লোককে ওই সময় তাঁর ঘরে দেখতে পেলে উনি চমকে উঠতেন নিশ্চয়ই। তাহলে সেই পরিচিত লোকটা কে মেঘরাজবাবু ?'
'নিমাই যে সত্যি কথা বলছে তার প্রমান কী ?'
মেঘরাজ সোম কিছুতেই দমবার পাত্র নন।
'প্রমাণ তো আপনি নিজের হাতে সেভ করেছেন মেঘরাজবাবু।'
উত্তরটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দিল লেটুশদা।
'যে মোবাইল এখন পুলিশের কাছে সিজ করা আছে। আপনি আগের রাতেই নিমাইকে বলে রেখেছিলেন সকাল ছ'টার সময় আপনাদের চা দিয়ে ডাকতে। কিন্তু অনুমান করা খুব ভুল হবে না, যে আগের রাতে আবার অশান্তি করার কারণে আপনি এবং পূবালিদেবী কেউই রাত্রে ঘুমান নি। ভোর পৌনে চারটের সময় যখন পূবালিদেবী ব্যালকনির দিকে যাচ্ছিলেন আপনি আপনার মোবাইলের অডিও রেকর্ডিংটা চেপে দেন। তারপর পিছন থেকে ওনার গলার হারটা টেনেই ওনাকে খুন করেন। আর পুরো ঘটনাটাই আপনার মোবাইলে রেকর্ড হয়ে যায়। পুরো রেকর্ডিংটাকে মোবাইলের রিংটোন বানিয়ে দেন। তারপর ফোনটা রেখে দেন পূবালীদেবীর পাশে, মানে ওঁর দেহের পাশে। ব্যস, কাজ শেষ।'
মেঘরাজ সোম নিজের হাতের আঙুল মটকাচ্ছেন। এতক্ষন উদ্দালক বাবুর দিকে নজর পড়েনি। এবার দেখলাম, উনি একদৃষ্টে ব্যালকনি থেকে দূরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন। মাধুরীদেবী মাথা নীচু করে বিছানায় বসে আছেন। মনে হচ্ছে কোনও কথা বলতে গেলেই কেঁদে ফেলবেন।
'কাজ শেষ করে, আপনি ভালো মানুষের মতো সানরাইজ দেখতে চলে যান উদ্দালকবাবুদের সাথে। নিমাই আসবে ছ'টার সময়। তাই বাইরের কোনও জায়গা থেকে ছ'টার সময় শুধু একবার ফোন করেছিলেন আপনার নিজেরই নম্বরে। কারণ সেটা রয়েছে পূবালী দেবীর দেহের পাশেই। সেই ফোনের রিংটোন শুনে বাইরের যেকোনো লোকই ভাববে খুনটা তখন হচ্ছে। আমি ঠিক বলছিতো উদ্দালকবাবু ?' হঠাৎ প্রশ্ন করল লেটুশদা।
উদ্দালক বসু মাথা নেড়ে "হ্যাঁ" বললেন।
'বলল, ফোনটা নাকি হোটেলেই ফেলে এসেছে। আমার ফোন থেকেই ফোন করল।' উদ্দালক বাবুর কথাগুলো যেন অনেক দূর থেকে আসছে।
'মিথ্যে, মিথ্যে কথা ! বানানো গল্প পুরো !' চেঁচিয়ে উঠলেন মেঘরাজ সোম।
'মিথ্যে কথা ?'এতো স্মার্ট লেটুশদাকে আমার কোনোদিন লাগেনি। 'মিস্টার মিশ্র রিংটোনটা একবার বাজান তো ! নম্বরটা আপনিই বলবেন তো?'
রাগে ঠোঁট কাঁপছে সোমের | তাও তিনি বললেন,
'নাইন এইট থ্রী ওয়ান, ডাবল সিক্স ফোর, ফোর ওয়ান সিক্স।'
ফোন অন করে সেই নম্বর অনুযায়ী ফোন করতেই, যেটা বেজে উঠলো সেটা শুনে চমকে উঠলেন ঘরের সবাই। যেমন আমরা চমকে উঠেছিলাম, ভোরবেলা সমুদ্রের পাড়ে বুল্টির কবিতা শুনে। কারণ সকলের সামনে রিংটোনের বদলে যেটা বেজে উঠলো, সেটা নিমাইয়ের শোনা পূবালীদেবীর গান আর তারপর আর্তচিৎকার। ঘরের কেউই আর কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। শুধু একা বলে চলেছে লেটুশদা।
'শুধু এইটুকু করেই আপনি নিশ্চিন্ত হননি। আপনি চেয়েছিলেন খুনের সন্দেহটা যাতে অন্য কারোর ওপরে পড়ে। এই কারণে তদন্তের চোখ ঘুরিয়ে দেওয়া আপনার ভীষণ প্রয়োজন ছিল। খুনের পরপরই আপনি উদ্দালকবাবুদের ঘরে আসেন এবং ছাইদানি থেকে ফিল্টারের টুকরো এবং ঘড়িটা তুলে এনে আপনার ঘরে রেখে দেন। এখন প্রশ্ন হল কীভাবে ? এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করে আমার ভাই জয়ন্ত।'
আমার মাথাতে কিছুই আসছে না। লেটুশদাই বলল,
'গতকাল দুপুরে ও আপনাদের ক্যারেক্টারিস্টিকের একটা তালিকা তৈরী করে। একটা ব্যাপার আমার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। এই তালিকা থেকে সেটা আবার মনে পড়ে গেল। আর তা হল, উদ্দালকবাবুর এসি সহ্য হয়না।'
উদ্দালকবাবু ব্যালকনি দিয়ে এখনও বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন।
'এসি যখন চালান না, তখন রাত্রে জানলা খুলে শোওয়া মোটেই আশ্চর্য লাগার মতো কিছু নয়। চারটের আসেপাশে ওনার ঘরের জানলা দিয়ে সিগারেটের টুকরো আর ঘড়ি বের করে নেন আপনি। অর্থাৎ, পুলিশের অনুমান সঠিক। চুরি নিশ্চয়ই হয়েছে, এবং এক্ষেত্রে চোরটাও আপনি।' লেটুশদার আঙুল মেঘরাজ সোমের দিকে। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছেনা, উনি আর একটাও কথা বলতে পারবেন বলে।
'আপনার মনে হল, বডির পাশে উদ্দালকবাবুর সিগারেট আর ঘড়ি পড়ে থাকলেই সন্দেহটা ওনার ওপরে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আপনার জানা ছিলনা, আপনার ট্রেনের এই সহযাত্রীটির সবথেকে প্রিয় নেশা হল, সূক্ষ সাল শস্য, মানে অনু সন ধান। সিগারেট আর ঘড়ি দেখে উদ্দালকবাবুর কথা মনে হয় বলেই, সন্দেহটা আরও বেশি করে আপনার ওপর পড়ে। পূবালীদেবী ছিলেন মেঘরাজ সোমের গোল্ডেন এগ ডাক। সোনার ডিমপাড়া হাঁস। ঠিক বলছিতো মেঘরাজ বাবু ?'
মেঘরাজ সোম রাগে ফুঁসছেন কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না।
'কিন্তু সেই আমদানিও তো বন্ধ হয়ে গেল।'
ইন্সপেক্টর মিশ্র এবার হকচকিয়ে তাকালেন লেটুশদার দিকে।
'কাল গ্র্যান্ড রোডের ওড়িশা মেডিক্যাল শপের বাইরে হঠাৎই দেখা হয়ে গেল পূবালীদেবীর ভাই পুলকবাবুর সাথে। তারপর সমুদ্রের ধারে প্রায় একঘন্টা সময় কাটালাম ওনার সঙ্গে।'
মেঘরাজবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন লেটুশদার দিকে |
'পূবালিদেবীর বাবা মানে মেঘরাজবাবুর শ্বশুরমশায়ের বাইপাস সার্জারি হয় দু'বছর আগে। খুব সঙ্গত কারণেই উনি জানাতে বাধ্য হন মেঘরাজ বাবুদের কোনোরকম আর্থিক সাহায্য আর ওনার পক্ষে করা সম্ভব নয়। সংসার চালানোই মুশকিল হয়ে ওঠে সোমের পক্ষে। শুরু হয় পূবালিদেবীর ওপর শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার। আরও কথা হতো পুলকবাবুর সঙ্গে। কিন্তু তখন আমার মাথায় সদ্য ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। মাথা টনটন করছিল।'
সত্যি, মানুষ বটে লেটুশদা ! এতো রাগ হচ্ছিল নিমাই নায়েকের ওপর যে বলতে পারিনা। যদিও ওতো শুধুমাত্র হুকুম পালন করেছে। আসল দোষী তো এখন ভিজে বেড়াল সেজে মাথা নীচু করে বসে আছেন। এতক্ষন বাদে পকেট থেকে ক্লাসিকের প্যাকেট বার করে একটা সিগারেট ধরালেন উদ্দালক বসু।
লেটুশদা বলে চলল, 'ঠিক এই অবস্থায় ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় আসেন প্রতিষ্ঠিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার উদ্দালক বসু। আশুতোষ কলেজের প্রাক্তনীর ফেসবুক গ্রূপের ছবি অন্তত তাই বলছে। একই সঙ্গে শুরু সোমবাড়িতে উদ্দালকবাবুর যাতায়াত। কারণ একসময় ওনাদের মধ্যে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল।'
আশ্চর্য এটাই,ওনার নিজের সম্মন্ধে কথা শুরু হওয়ার পরেও উদ্দালকবাবুর আচরণে কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। সামান্য চমকেও উঠলেন না উনি। এখনও শূন্য দৃষ্টিতে একইরকম তাকিয়ে আছেন সমুদ্রের দিকে। সূর্য ঢেকে গেছে। আকাশে মেঘ। সমুদ্রের জলের রঙ কালচে নীল।
'উদ্দালকবাবুকে দেখে আপনার মনে শুরু হল এক অদ্ভুত কমপ্লেক্স। সহজ বাংলায় হিংসা।'
কথাগুলো বলা হচ্ছে সোমকে।
'অথচ পূবালীদেবী যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। উদ্দালকবাবু বাড়ি এলেই পূবালীদেবীর মধ্যে যে খুশির ঝলক দেখা যেত, বিয়ের পর থেকে তা আপনি কোনোদিন দেখেননি। কিন্তু সেটা ছিল শুধুই নিখাদ, সরল বন্ধুত্ব। যেটাকে আপনার নোংরা হিংসায় ঢাকা মন অন্যরকম কিছুই ভেবে নিয়েছিল।'
'পূবালী ওকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারতো না। উদয়-উদয়-উদয়, অসহ্য !' আবার চেঁচিয়ে উঠলেন মেঘরাজ সোম।
'এতটাই অসহ্য হয়ে উঠলেন যে,পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ল ?'
পরের কথাটায় আমি আবিষ্কার করলাম এক নতুন শশাঙ্ক সেনকে। ইনভেস্টিগেটর নয়, মানবিক লেটুশদাকে।
'মেঘরাজ বাবু, ইনি তো সেই পূবালী যিনি না থাকলে, আপনি বেঁচেই থাকতেন না। চক্রবেরিয়ার বাজারে লোকের মারের হাত থেকে বাঁচিয়ে ছিলেন আপনাকে। না খেয়ে থাকলেও কারোর কাছে প্রতিবাদ করেননি। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েও কাউকে জানতে পর্যন্ত দেননি। আপনি সব ভুলে গেলেন মেঘরাজবাবু ?'
মেঘরাজ সোম বোধহয় চোখ ঢেকে কেঁদে ফেললেন।
'একজন কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারার হয়ে আর দয়া করে কান্নাকাটির নাটকটা করবেন না,প্লিজ !'
আমি উদ্দালক বসুর প্রতিক্রিয়া দেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু সেটা করতে হলে উঠে ওনার সামনে যেতে হয়। এই মুহূর্তে পুলীন পুরীর একশ সাত নম্বর ঘরের লোম খাড়া করা পরিস্থিতিতে যেটা অসম্ভব।
'আসলে আপনার জীবনে পূবালীদেবীর প্রয়োজন ফুরিয়ে এসেছিল। সাথে যোগ হল উদ্দালকবাবুর ওপর হিংসা।'
লেটুশদার মুখ থেকে কথাগুলো বেরোচ্ছে ধারালো ছুরির মতো।
'কিন্তু কলকাতায় কিছু করতে আপনার ভীষণ অসুবিধা হচ্ছিল। ঠিক তখনই আপনি শুনলেন,উদ্দালকবাবুরা পুরী আসছেন। আপনাকেও তাই পূবালিদেবীকে নিয়ে এখানেই আসতে হল। কারণ, বিয়ের আগে পূবালীদেবী এবং উদ্দালকবাবুর সম্পর্কের কথা দুই পরিবারের প্রায় সকলেই জানতেন। তাই এখানে খুনটা হলে, সন্দেহটা প্রথম গিয়ে পড়বে ওনার ওপরেই। আপনাকে সাহায্য করল ব্রিটিশ বারে ওনার অসংলগ্ন আচরণ। এই সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায় মেঘরাজবাবু ?'
এতক্ষন বাদে উদ্দালক বসু মুখ ঘোরালেন মেঘরাজ সোমের দিকে। কী অদ্ভুত ঠান্ডা সেই দৃষ্টি, ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
"আপনি প্রমাণও জোগাড় করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেই ঠুনকো প্রমাণ শশাঙ্ক সেনের মনে ধরল না।'
'আপনি মানে রীতিমতো একটা ইয়ে...'
ইয়ে বলতে ইন্সপেক্টর পুরুষোত্তম মিশ্র কী যে বোঝাতে চাইলেন, লেটুশদা বুঝলেও আমি বুঝলাম না।
'কিন্তু কোনও মানুষ কি এতো সহজে খুন করতে পারে ?'
বলল লেটুশদা।
'হ্যাঁ, আমিও সেটাই ভাবছিলাম।' থুতনির তলায় হাতের মুঠোটা এনে হঠাৎ ভাবুকের মতো বলে উঠলেন কদমকৃষ্ণবাবু।
'আপনার ভাবনার কথা পরে শুনবো।'
লেটুশদা অসম্ভব গম্ভীর।
'তখনই আমার মনে পড়ে গেল গত মাসে পড়া ওয়েব এমডির একটা আর্টিকেলের কথা। তাতে বলছে, ক্রিমিনাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, যার লক্ষণই হল বড় রকমের ক্রিমিনাল কাজকর্ম। যেমনটা টেড বান্ডি করেছিলেন উনিশশ সত্তর সালে। ঠিক তার আগের বছরই মানে সিক্সটি নাইনে এই একইরকম কান্ড করেছিলেন চার্লস ম্যানসন। কেপিডি বা সিজোফ্রনিয়াতে যে শুধুমাত্র হ্যালুসিয়েশনই নয় তাই নয়, একই সঙ্গে এটা বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারও বটে। এইরকম রোগ অনেকধরণের লক্ষণ দেখে ডিটেক্ট করা যায়। যেমন,ব্লেড দিয়ে নিজের হাত কাটা। প্রথমদিন মানে ট্রেনে মেঘরাজবাবুকে দেখেই বুঝে যাই ওনার মধ্যে কেপিডি-র অনেক চিহ্ন বর্তমান। আপনার বাঁহাতটা একবার দেখাবেন মেঘরাজবাবু ?'
আমরা ঘরের প্রায় সকলেই দেখলাম সারা হাতে অন্তত দশটা ব্লেড দিয়ে করা ক্ষতচিহ্ন। ইন্সপেক্টর মিশ্র চোখ দিয়ে লেটুশদাকে কুর্নিশ জানালেন।
'তবে উনি যে এত বড় কান্ড করতে চলেছেন, সেটা কি আমি জানতাম !'
এতক্ষন কথা বলে, এবার মাথার বাঁদিকটা চেপে ধরল লেটুশদা। নিশ্চয়ই খুব যন্ত্রণা করছে। বাবা-মা জানতে পারলে আর রক্ষা থাকবে না ! চেয়ারে বসে আবার বলে উঠল,
'খুনের পরপরই সাকরেদটাকে তো দারুন জোগাড় করেছেন মিস্টার সোম। খুনের আগে আপনার সঙ্গে নিমাইয়ের যোগাযোগ ছিলনা ঠিকই। কিন্তু খুনের পরপরই বিশেষত হারটা সরিয়ে ফেলার জন্য আপনার নিমাইয়ের সাহায্য প্রয়োজন হয়। এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় লোকই কাজ দেয় বেশি। খুনের দিন বিকেলেই আপনার সঙ্গে ওকে বিচে দেখেছিলাম। আমার মামাতো ভাই আর বন্ধু শুধু আপনাকে দেখেছে। কারণ, ওদের দূরের দৃষ্টি আমার থেকে ঝাপসা। তোমার মাছের ক্ষতি তো পুষিয়ে গেল নিমাই !'
নিমাই নায়েককে এখন শক্ত হাতে ধরে আছেন ম্যানেজার সেনাপতি।
'নিন মিস্টার মিশ্র,এই দুই মহাপুরুষকে আপনার হাতে তুলে দিলাম। এবার যা করার উড়িষ্যা পুলিশ করবে।'
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। সমুদ্রের প্রচন্ড গর্জন ছাড়া ঘরে আর একটা শব্দ হচ্ছে। পূবালিদেবীর ওড়নাটা আঁকড়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদছেন মাধুরী বসু।
পরদিন, অর্থাৎ সাতাশে মে আমরা কোনারক দেখতে যাবো। ইউনেস্কোর হেরিটেজ সাইট নিয়ে এখন সমুদ্রের পাড়ে বসে স্পিচ দিচ্ছে লেটুশদা। কেষ্টদার বিস্কুট আর চানাচুর সমানে চলছে। আফসোস একটাই ডালমুট শেষ হয়ে গেছে।
'এবারে আসি নিমাই যা শুনতে পেয়েছিল সেই কথায়। প্রথমে পূবালিদেবীর গুনগুন গান। তারপরেই আর্তনাদ। অর্থাৎ, কাউকে দেখে চমকে যাওয়ার কোনও শব্দ নেই। অপরিচিত কোনও লোককে ওই সময় তাঁর ঘরে দেখতে পেলে উনি চমকে উঠতেন নিশ্চয়ই। তাহলে সেই পরিচিত লোকটা কে মেঘরাজবাবু ?'
'নিমাই যে সত্যি কথা বলছে তার প্রমান কী ?'
মেঘরাজ সোম কিছুতেই দমবার পাত্র নন।
'প্রমাণ তো আপনি নিজের হাতে সেভ করেছেন মেঘরাজবাবু।'
উত্তরটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দিল লেটুশদা।
'যে মোবাইল এখন পুলিশের কাছে সিজ করা আছে। আপনি আগের রাতেই নিমাইকে বলে রেখেছিলেন সকাল ছ'টার সময় আপনাদের চা দিয়ে ডাকতে। কিন্তু অনুমান করা খুব ভুল হবে না, যে আগের রাতে আবার অশান্তি করার কারণে আপনি এবং পূবালিদেবী কেউই রাত্রে ঘুমান নি। ভোর পৌনে চারটের সময় যখন পূবালিদেবী ব্যালকনির দিকে যাচ্ছিলেন আপনি আপনার মোবাইলের অডিও রেকর্ডিংটা চেপে দেন। তারপর পিছন থেকে ওনার গলার হারটা টেনেই ওনাকে খুন করেন। আর পুরো ঘটনাটাই আপনার মোবাইলে রেকর্ড হয়ে যায়। পুরো রেকর্ডিংটাকে মোবাইলের রিংটোন বানিয়ে দেন। তারপর ফোনটা রেখে দেন পূবালীদেবীর পাশে, মানে ওঁর দেহের পাশে। ব্যস, কাজ শেষ।'
মেঘরাজ সোম নিজের হাতের আঙুল মটকাচ্ছেন। এতক্ষন উদ্দালক বাবুর দিকে নজর পড়েনি। এবার দেখলাম, উনি একদৃষ্টে ব্যালকনি থেকে দূরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন। মাধুরীদেবী মাথা নীচু করে বিছানায় বসে আছেন। মনে হচ্ছে কোনও কথা বলতে গেলেই কেঁদে ফেলবেন।
'কাজ শেষ করে, আপনি ভালো মানুষের মতো সানরাইজ দেখতে চলে যান উদ্দালকবাবুদের সাথে। নিমাই আসবে ছ'টার সময়। তাই বাইরের কোনও জায়গা থেকে ছ'টার সময় শুধু একবার ফোন করেছিলেন আপনার নিজেরই নম্বরে। কারণ সেটা রয়েছে পূবালী দেবীর দেহের পাশেই। সেই ফোনের রিংটোন শুনে বাইরের যেকোনো লোকই ভাববে খুনটা তখন হচ্ছে। আমি ঠিক বলছিতো উদ্দালকবাবু ?' হঠাৎ প্রশ্ন করল লেটুশদা।
উদ্দালক বসু মাথা নেড়ে "হ্যাঁ" বললেন।
'বলল, ফোনটা নাকি হোটেলেই ফেলে এসেছে। আমার ফোন থেকেই ফোন করল।' উদ্দালক বাবুর কথাগুলো যেন অনেক দূর থেকে আসছে।
'মিথ্যে, মিথ্যে কথা ! বানানো গল্প পুরো !' চেঁচিয়ে উঠলেন মেঘরাজ সোম।
'মিথ্যে কথা ?'এতো স্মার্ট লেটুশদাকে আমার কোনোদিন লাগেনি। 'মিস্টার মিশ্র রিংটোনটা একবার বাজান তো ! নম্বরটা আপনিই বলবেন তো?'
রাগে ঠোঁট কাঁপছে সোমের | তাও তিনি বললেন,
'নাইন এইট থ্রী ওয়ান, ডাবল সিক্স ফোর, ফোর ওয়ান সিক্স।'
ফোন অন করে সেই নম্বর অনুযায়ী ফোন করতেই, যেটা বেজে উঠলো সেটা শুনে চমকে উঠলেন ঘরের সবাই। যেমন আমরা চমকে উঠেছিলাম, ভোরবেলা সমুদ্রের পাড়ে বুল্টির কবিতা শুনে। কারণ সকলের সামনে রিংটোনের বদলে যেটা বেজে উঠলো, সেটা নিমাইয়ের শোনা পূবালীদেবীর গান আর তারপর আর্তচিৎকার। ঘরের কেউই আর কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। শুধু একা বলে চলেছে লেটুশদা।
'শুধু এইটুকু করেই আপনি নিশ্চিন্ত হননি। আপনি চেয়েছিলেন খুনের সন্দেহটা যাতে অন্য কারোর ওপরে পড়ে। এই কারণে তদন্তের চোখ ঘুরিয়ে দেওয়া আপনার ভীষণ প্রয়োজন ছিল। খুনের পরপরই আপনি উদ্দালকবাবুদের ঘরে আসেন এবং ছাইদানি থেকে ফিল্টারের টুকরো এবং ঘড়িটা তুলে এনে আপনার ঘরে রেখে দেন। এখন প্রশ্ন হল কীভাবে ? এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করে আমার ভাই জয়ন্ত।'
আমার মাথাতে কিছুই আসছে না। লেটুশদাই বলল,
'গতকাল দুপুরে ও আপনাদের ক্যারেক্টারিস্টিকের একটা তালিকা তৈরী করে। একটা ব্যাপার আমার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। এই তালিকা থেকে সেটা আবার মনে পড়ে গেল। আর তা হল, উদ্দালকবাবুর এসি সহ্য হয়না।'
উদ্দালকবাবু ব্যালকনি দিয়ে এখনও বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন।
'এসি যখন চালান না, তখন রাত্রে জানলা খুলে শোওয়া মোটেই আশ্চর্য লাগার মতো কিছু নয়। চারটের আসেপাশে ওনার ঘরের জানলা দিয়ে সিগারেটের টুকরো আর ঘড়ি বের করে নেন আপনি। অর্থাৎ, পুলিশের অনুমান সঠিক। চুরি নিশ্চয়ই হয়েছে, এবং এক্ষেত্রে চোরটাও আপনি।' লেটুশদার আঙুল মেঘরাজ সোমের দিকে। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছেনা, উনি আর একটাও কথা বলতে পারবেন বলে।
'আপনার মনে হল, বডির পাশে উদ্দালকবাবুর সিগারেট আর ঘড়ি পড়ে থাকলেই সন্দেহটা ওনার ওপরে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আপনার জানা ছিলনা, আপনার ট্রেনের এই সহযাত্রীটির সবথেকে প্রিয় নেশা হল, সূক্ষ সাল শস্য, মানে অনু সন ধান। সিগারেট আর ঘড়ি দেখে উদ্দালকবাবুর কথা মনে হয় বলেই, সন্দেহটা আরও বেশি করে আপনার ওপর পড়ে। পূবালীদেবী ছিলেন মেঘরাজ সোমের গোল্ডেন এগ ডাক। সোনার ডিমপাড়া হাঁস। ঠিক বলছিতো মেঘরাজ বাবু ?'
মেঘরাজ সোম রাগে ফুঁসছেন কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না।
'কিন্তু সেই আমদানিও তো বন্ধ হয়ে গেল।'
ইন্সপেক্টর মিশ্র এবার হকচকিয়ে তাকালেন লেটুশদার দিকে।
'কাল গ্র্যান্ড রোডের ওড়িশা মেডিক্যাল শপের বাইরে হঠাৎই দেখা হয়ে গেল পূবালীদেবীর ভাই পুলকবাবুর সাথে। তারপর সমুদ্রের ধারে প্রায় একঘন্টা সময় কাটালাম ওনার সঙ্গে।'
মেঘরাজবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন লেটুশদার দিকে |
'পূবালিদেবীর বাবা মানে মেঘরাজবাবুর শ্বশুরমশায়ের বাইপাস সার্জারি হয় দু'বছর আগে। খুব সঙ্গত কারণেই উনি জানাতে বাধ্য হন মেঘরাজ বাবুদের কোনোরকম আর্থিক সাহায্য আর ওনার পক্ষে করা সম্ভব নয়। সংসার চালানোই মুশকিল হয়ে ওঠে সোমের পক্ষে। শুরু হয় পূবালিদেবীর ওপর শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার। আরও কথা হতো পুলকবাবুর সঙ্গে। কিন্তু তখন আমার মাথায় সদ্য ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। মাথা টনটন করছিল।'
সত্যি, মানুষ বটে লেটুশদা ! এতো রাগ হচ্ছিল নিমাই নায়েকের ওপর যে বলতে পারিনা। যদিও ওতো শুধুমাত্র হুকুম পালন করেছে। আসল দোষী তো এখন ভিজে বেড়াল সেজে মাথা নীচু করে বসে আছেন। এতক্ষন বাদে পকেট থেকে ক্লাসিকের প্যাকেট বার করে একটা সিগারেট ধরালেন উদ্দালক বসু।
লেটুশদা বলে চলল, 'ঠিক এই অবস্থায় ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় আসেন প্রতিষ্ঠিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার উদ্দালক বসু। আশুতোষ কলেজের প্রাক্তনীর ফেসবুক গ্রূপের ছবি অন্তত তাই বলছে। একই সঙ্গে শুরু সোমবাড়িতে উদ্দালকবাবুর যাতায়াত। কারণ একসময় ওনাদের মধ্যে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল।'
আশ্চর্য এটাই,ওনার নিজের সম্মন্ধে কথা শুরু হওয়ার পরেও উদ্দালকবাবুর আচরণে কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। সামান্য চমকেও উঠলেন না উনি। এখনও শূন্য দৃষ্টিতে একইরকম তাকিয়ে আছেন সমুদ্রের দিকে। সূর্য ঢেকে গেছে। আকাশে মেঘ। সমুদ্রের জলের রঙ কালচে নীল।
'উদ্দালকবাবুকে দেখে আপনার মনে শুরু হল এক অদ্ভুত কমপ্লেক্স। সহজ বাংলায় হিংসা।'
কথাগুলো বলা হচ্ছে সোমকে।
'অথচ পূবালীদেবী যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। উদ্দালকবাবু বাড়ি এলেই পূবালীদেবীর মধ্যে যে খুশির ঝলক দেখা যেত, বিয়ের পর থেকে তা আপনি কোনোদিন দেখেননি। কিন্তু সেটা ছিল শুধুই নিখাদ, সরল বন্ধুত্ব। যেটাকে আপনার নোংরা হিংসায় ঢাকা মন অন্যরকম কিছুই ভেবে নিয়েছিল।'
'পূবালী ওকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারতো না। উদয়-উদয়-উদয়, অসহ্য !' আবার চেঁচিয়ে উঠলেন মেঘরাজ সোম।
'এতটাই অসহ্য হয়ে উঠলেন যে,পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ল ?'
পরের কথাটায় আমি আবিষ্কার করলাম এক নতুন শশাঙ্ক সেনকে। ইনভেস্টিগেটর নয়, মানবিক লেটুশদাকে।
'মেঘরাজ বাবু, ইনি তো সেই পূবালী যিনি না থাকলে, আপনি বেঁচেই থাকতেন না। চক্রবেরিয়ার বাজারে লোকের মারের হাত থেকে বাঁচিয়ে ছিলেন আপনাকে। না খেয়ে থাকলেও কারোর কাছে প্রতিবাদ করেননি। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েও কাউকে জানতে পর্যন্ত দেননি। আপনি সব ভুলে গেলেন মেঘরাজবাবু ?'
মেঘরাজ সোম বোধহয় চোখ ঢেকে কেঁদে ফেললেন।
'একজন কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারার হয়ে আর দয়া করে কান্নাকাটির নাটকটা করবেন না,প্লিজ !'
আমি উদ্দালক বসুর প্রতিক্রিয়া দেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু সেটা করতে হলে উঠে ওনার সামনে যেতে হয়। এই মুহূর্তে পুলীন পুরীর একশ সাত নম্বর ঘরের লোম খাড়া করা পরিস্থিতিতে যেটা অসম্ভব।
'আসলে আপনার জীবনে পূবালীদেবীর প্রয়োজন ফুরিয়ে এসেছিল। সাথে যোগ হল উদ্দালকবাবুর ওপর হিংসা।'
লেটুশদার মুখ থেকে কথাগুলো বেরোচ্ছে ধারালো ছুরির মতো।
'কিন্তু কলকাতায় কিছু করতে আপনার ভীষণ অসুবিধা হচ্ছিল। ঠিক তখনই আপনি শুনলেন,উদ্দালকবাবুরা পুরী আসছেন। আপনাকেও তাই পূবালিদেবীকে নিয়ে এখানেই আসতে হল। কারণ, বিয়ের আগে পূবালীদেবী এবং উদ্দালকবাবুর সম্পর্কের কথা দুই পরিবারের প্রায় সকলেই জানতেন। তাই এখানে খুনটা হলে, সন্দেহটা প্রথম গিয়ে পড়বে ওনার ওপরেই। আপনাকে সাহায্য করল ব্রিটিশ বারে ওনার অসংলগ্ন আচরণ। এই সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায় মেঘরাজবাবু ?'
এতক্ষন বাদে উদ্দালক বসু মুখ ঘোরালেন মেঘরাজ সোমের দিকে। কী অদ্ভুত ঠান্ডা সেই দৃষ্টি, ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
"আপনি প্রমাণও জোগাড় করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেই ঠুনকো প্রমাণ শশাঙ্ক সেনের মনে ধরল না।'
'আপনি মানে রীতিমতো একটা ইয়ে...'
ইয়ে বলতে ইন্সপেক্টর পুরুষোত্তম মিশ্র কী যে বোঝাতে চাইলেন, লেটুশদা বুঝলেও আমি বুঝলাম না।
'কিন্তু কোনও মানুষ কি এতো সহজে খুন করতে পারে ?'
বলল লেটুশদা।
'হ্যাঁ, আমিও সেটাই ভাবছিলাম।' থুতনির তলায় হাতের মুঠোটা এনে হঠাৎ ভাবুকের মতো বলে উঠলেন কদমকৃষ্ণবাবু।
'আপনার ভাবনার কথা পরে শুনবো।'
লেটুশদা অসম্ভব গম্ভীর।
'তখনই আমার মনে পড়ে গেল গত মাসে পড়া ওয়েব এমডির একটা আর্টিকেলের কথা। তাতে বলছে, ক্রিমিনাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, যার লক্ষণই হল বড় রকমের ক্রিমিনাল কাজকর্ম। যেমনটা টেড বান্ডি করেছিলেন উনিশশ সত্তর সালে। ঠিক তার আগের বছরই মানে সিক্সটি নাইনে এই একইরকম কান্ড করেছিলেন চার্লস ম্যানসন। কেপিডি বা সিজোফ্রনিয়াতে যে শুধুমাত্র হ্যালুসিয়েশনই নয় তাই নয়, একই সঙ্গে এটা বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারও বটে। এইরকম রোগ অনেকধরণের লক্ষণ দেখে ডিটেক্ট করা যায়। যেমন,ব্লেড দিয়ে নিজের হাত কাটা। প্রথমদিন মানে ট্রেনে মেঘরাজবাবুকে দেখেই বুঝে যাই ওনার মধ্যে কেপিডি-র অনেক চিহ্ন বর্তমান। আপনার বাঁহাতটা একবার দেখাবেন মেঘরাজবাবু ?'
আমরা ঘরের প্রায় সকলেই দেখলাম সারা হাতে অন্তত দশটা ব্লেড দিয়ে করা ক্ষতচিহ্ন। ইন্সপেক্টর মিশ্র চোখ দিয়ে লেটুশদাকে কুর্নিশ জানালেন।
'তবে উনি যে এত বড় কান্ড করতে চলেছেন, সেটা কি আমি জানতাম !'
এতক্ষন কথা বলে, এবার মাথার বাঁদিকটা চেপে ধরল লেটুশদা। নিশ্চয়ই খুব যন্ত্রণা করছে। বাবা-মা জানতে পারলে আর রক্ষা থাকবে না ! চেয়ারে বসে আবার বলে উঠল,
'খুনের পরপরই সাকরেদটাকে তো দারুন জোগাড় করেছেন মিস্টার সোম। খুনের আগে আপনার সঙ্গে নিমাইয়ের যোগাযোগ ছিলনা ঠিকই। কিন্তু খুনের পরপরই বিশেষত হারটা সরিয়ে ফেলার জন্য আপনার নিমাইয়ের সাহায্য প্রয়োজন হয়। এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় লোকই কাজ দেয় বেশি। খুনের দিন বিকেলেই আপনার সঙ্গে ওকে বিচে দেখেছিলাম। আমার মামাতো ভাই আর বন্ধু শুধু আপনাকে দেখেছে। কারণ, ওদের দূরের দৃষ্টি আমার থেকে ঝাপসা। তোমার মাছের ক্ষতি তো পুষিয়ে গেল নিমাই !'
নিমাই নায়েককে এখন শক্ত হাতে ধরে আছেন ম্যানেজার সেনাপতি।
'নিন মিস্টার মিশ্র,এই দুই মহাপুরুষকে আপনার হাতে তুলে দিলাম। এবার যা করার উড়িষ্যা পুলিশ করবে।'
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। সমুদ্রের প্রচন্ড গর্জন ছাড়া ঘরে আর একটা শব্দ হচ্ছে। পূবালিদেবীর ওড়নাটা আঁকড়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদছেন মাধুরী বসু।
পরদিন, অর্থাৎ সাতাশে মে আমরা কোনারক দেখতে যাবো। ইউনেস্কোর হেরিটেজ সাইট নিয়ে এখন সমুদ্রের পাড়ে বসে স্পিচ দিচ্ছে লেটুশদা। কেষ্টদার বিস্কুট আর চানাচুর সমানে চলছে। আফসোস একটাই ডালমুট শেষ হয়ে গেছে।
(সমাপ্ত)

Comments
Post a Comment