Skip to main content

লেটুশদার হাতেখড়ি (পর্ব পাঁচ)


                              লেটুশদার হাতেখড়ি

                                                           তৃণাঞ্জয় ভট্টাচাৰ্য

                                                           ( পর্ব – পাঁচ )



আমি জানি লেটুশদা এই মুহূর্তে মেঘরাজ বাবু, উদ্দালক ও মাধুরী বসু কাউকেই বিরক্ত করতে চায় না। এমনও তো হতে পারে পুলিশ যেটা বলছে সেইটাই ঠিক। এটা একটা সাধারণ চোরেরই কাজ। শুধু শুধু ব্যাপারটাকে জটিল বানানোর তো কোনও দরকার নেই। কিন্তু লেটুশদার ভ্রু তাহলে এখনও কেন কুঁচকে রয়েছে? আর তাছাড়া, লেটুশদা সবসময়ই বলে ওর গুরু প্রদোষ মিত্রের মতে, খুন জিনিসটা এতো সহজ নয়। সবার পক্ষে সেটা সম্ভবও নয়।  আর একজন সাধারণ চোর, শুধুমাত্র একটা হারের জন্য একটা হোটেলে ঢুকে, এতো বড় ঝুঁকি নিয়ে একটা মানুষকে খুন করে ফেলবে ? এটাতে আমার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না।  লেটুশদা বলল,

'এখন হোটেলে ফিরবেন নাকি ?'

-'না, ভাবছিলাম সমুদ্রের ধার ধরে একটু হাঁটলে হতো না ? এখনও পর্যন্ত সেটা তো আর করাই হয়নি।' আক্ষেপের সুরে বললেন কেষ্টদা |

'বেশ তো চলুন', লেটুশদার যথেষ্ট উৎসাহ আছে বলে মনে হলো।


বিবেকানন্দ মূর্তির থেকে বিচ ধরে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। আমাদের ডানদিকে একে একে পেরিয়ে যাচ্ছে শকুন্তলা হোটেল, পুরী হোটেল, ওটিডিসি। যে হোটেলটা এর আগে পর্যন্ত দেখতে ভালো লাগতো, গোধূলির আলোতে সেই পুলীন পুরী হোটেল দেখে গাটা যেন কেমন ছমছম করে উঠল। গত বারো ঘন্টার মধ্যে ছবিটা যেন বদলে গিয়েছে পুরো। লেটুশদার কানে ফোন। কারোর সঙ্গে ও কথা বলছে। যদিও সমুদ্রের শব্দে কথাবার্তা কিছুই শোনা যাচ্ছে না। ফোন শেষ করে আমার কানের সামনে এসে বলল,

'কলকাতার মিক্সড চাট আর পুরীর মিস্কড চাট কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা।'

             মিক্সড চাট আর ফুচকা খেয়ে আমরা স্বর্গদ্বার পার করে হেঁটে চলেছি। এতো ভালো সূর্যাস্ত এর আগে কোথায় দেখেছি মনে করতে পারলাম না। আমাদের ডানদিকে রাস্তার ওপরে এখন পঞ্চাশ হাতের মধ্যেই ক্যামেলিয়া হোটেল। তার ঠিক সোজাসুজি বিচের ওপর একটাই চায়ের দোকান। মধুকর টি স্টল। সেই দোকানে বসে রয়েছে আমাদের চেনা বছর কুড়ির একটা ছেলে। পুলীন পুরী হোটেলের বয় নিমাই। এখন ডিমরুটি খাচ্ছে। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়ালো। হয়তো সকালে দেখার পর আমাদের পুলিশের লোক ভেবেছে। ওকে বসতে বলে ওর ঠিক পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসল লেটুশদা। আমরা দুজন ওর পাশের দুটো চেয়ারে। বসেই কদমকৃষ্ণবাবু তিনটে চায়ের অর্ডার দিয়ে দিলেন। বুঝলাম চেয়ারে বসার শর্তটা উনি ভুলে যাননি। নিজের কোনোরকম পরিচয় না দিয়ে, ছেলেটার সম্ভ্রমের সুযোগ নিয়ে, লেটুশদা তাকে প্রশ্ন করল,

'তোমার বাড়ি এখানেই ?'

'না, পূর্ব মেদিনীপুর, কন্টাই।' বলল নিমাই। গলায় অভিযোগের সুর।

'কী আপদ বলুন দিকি। হপ্তায় একদিন করে বাড়ি যাই, এখন এরা বলছে কোত্থাও যাওয়া যাবে নি !'

'তাতো বটেই।' লেটুশদার গলা গম্ভীর |

'তোমার পুরো নামটা কী?'

'নিমাই নায়েক।' ওকে দেখে মনে হচ্ছে সত্যিই জেরার উত্তর দিচ্ছে।

'তুমি যখন ঘরে চা নিয়ে গিয়েছিলে, তখন ঠিক কী কী শুনেছিলে, মনে আছে ? বলতে পারবে আমায় ?'

ঠান্ডা গলায় এইভাবে জেরা করতে এর আগেও লেটুশদাকে দেখেছি।

'হ্যাঁ, কিন্তু পুলিশদেরকে তো…',

ওর কথা থামিয়ে দিয়ে কড়া গলায় লেটুশদা বলে উঠলো,

'আর একবার বলতে তোমার আপত্তিটা কোথায় ?'

তারপর অপেক্ষাকৃত গলা নামিয়ে বলল,

'ভয়ের কিছু নেই, বল।'

'ভয় কেন পাব বাবু ! মেমসাহেব প্রথমে একটা গুনগুন করে গান গাইছিলেন। তারপর ধুপ করে কী একটা পড়ার শব্দ হল। তারপরেই আ আ করে চিৎকার।'

'আর কিছু শোনোনি ? মানে কাউকে দেখে চমকে যাওয়ার মত কোনও কথা বা শব্দ ?'

পুরোপুরি গোয়েন্দার জেরা শুরু করেছে লেটুশদা।

'না বাবু, তারপরই তো সেনাপতি স্যারকে ডাকতে গেলাম। আমরা কী জানি! বড় মানুষের ব্যাপার !'

কিছুক্ষন নীচের বালির দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বলল,

'জমিতে মাছের চাষ চলছে । এই হপ্তায় আটকে গেলাম। শিবু গায়েন সব ঝেড়ে দেবে।'

শেষ কথাটায় রাগ ঝরে পড়ল, নিমাই নায়েকের গলায়।

'আমি যাই বাবু ?'

'হ্যাঁ, এখন যেতে পারো।' নিশ্চিন্ত করে দিল লেটুশদা। নিমাই বালির পাড় ধরে জগন্নাথ কলোনির দিকে চলে গেল। ও চলে যেতেই আমরা তিনজনও এগিয়ে গেলাম সমুদ্রের দিকে, পা ভেজাবো বলে। এখন ভাটার সময়। জল এখন বেশ খানিকটা নীচের দিকে। জলের দিকে এগিয়ে যেতেই আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। ভিজে বালি ফুঁড়ে স্পষ্ট করে লেখা –

'গো ব্যাক টু কলকাতা।'

'হু হু হু হুমকি !' কথাগুলো কেঁপে গেল কদমকৃষ্ণবাবুর।

'হুমকি।' ভীষন নিশ্চিন্তে কথাটা বলে, পকেট থেকে গোল্ডফ্লেকের প্যাকেট বার করে আবার দেশলাইয়ের একটা কাঠিতেই সিগারেট ধরালো লেটুশদা। তারপর ক্যারমবোর্ডের স্ট্রাইকারের মতো করে কাঠিটা সমুদ্রের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল,

'সাবাস! গাড়ি ঠিক ট্র্যাকেই চলেছে রে জিতু।'

আমি যদিও কিছুই বুঝতে পারলাম না।


প্রায় রাত আটটার সময় সি-বিচ থেকে হোটেলে ফিরলাম আমরা। লেটুশদার ফোনে একটা ফোন এলো। থানা থেকে। পূবালিদেবীর পোস্টমর্টেম হয়ে গেছে। রিপোর্ট পাওয়া যাবে কাল সকালে থানায় গেলে। তারপর তাঁর দেহ নিয়ে মেঘরাজবাবু, উদ্দালকবাবু আর মাধুরীদেবী ফিরে যাবেন কলকাতায়। অবশ্যই পুলিশের পাহারাতে। আর তারপর থেকে মানে ওঁরা ফেরার পরের দিন থেকে কেসটা চলে যাবে কলকাতা পুলিশ এবং সিআইডি ওয়েস্ট বেঙ্গলের অধীনে। কেন জানিনা, আমার মন বলছিল লেটুশদাকে যদি কিছু করতে হয়,সেটা করতে হবে পুরীতেই, এই দুদিনের মধ্যেই।

'তুমি সমুদ্রের পাড়ে কার সাথে ফোনে কথা বলছিলে লেটুশদা ?'

প্রশ্নটা না করে আর থাকতে পারলাম না। মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে লেটুশদা বলল,

'পূর্ণ সিনেমার সামনে থাকে আমার এক বন্ধু পিনাকী চক্রবর্তী, তাঁর সঙ্গে।'

এই সুযোগে আর একটা কথাও জিজ্ঞেস করে ফেললাম,

'আচ্ছা, এই এতগুলো ঘটনা থেকে তোমার কী মনে হয় ?'

'মনে হয় এটাই, যে এরকম মাছের ঝোল হলে দুই প্লেট ভাত খাওয়া যায়।'


পরদিন আমাদের মন্দির দেখতে যাওয়ার কথা। পুরীর মন্দিরের কথা না বললে, অর্ধেক পুরীর কথাই বলা হয়না। এত মানুষের ঢল শুধুমাত্র চারধামের অন্যতম এই শ্রীক্ষেত্রের ধামকে কেন্দ্র করে। বর্তমানের যে স্থাপত্য তা এগারশ একষট্টি সালে তৈরী হয়। তৈরী করান রাজা অনন্তবর্মন। যদিও পরিকল্পনা করেন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন। মহারাজা ভরতের পুত্র। সাহেব নৃতত্ত্ববিদ জন ডহসন প্রথম জানিয়েছিলেন, এই ইন্দ্রদ্যুম্নই সমুদ্রপাড়ের এই উৎকলে জগন্নাথের মন্দির গড়ার পরিকল্পনা করেন। এই কথাগুলো আগেই জেনেছি ট্রেনে আসতে আসতে লেটুশদার থেকে। কদমকৃষ্ণবাবু আবার কথাগুলো ফোনে রেকর্ড করে রেখেছেন সালটাল গুলো ভুলে যাবেন বলে। আমরা মন্দিরের বাইরে রাখা জমানো জলে পা ডুবিয়ে মন্দিরে ঢুকব। এটা পশ্চিম দুয়ার। বাইরে দু-তিনটে জুয়েলারির দোকান। তারমধ্যে মহাপ্রভু জুয়েলার্স আর শুভদ্রা গোল্ড হাউস নজরে পড়ল। ঠিক তার সামনেই অটোস্ট্যান্ড। সার বেঁধে দাঁড়ানো হলুদ-কালো অটোর দল। আমাদের অটোর নম্বর ও-আর-এক-সাত, তেষট্টি সাঁইত্রিশ। হঠাৎ নিমাইয়ের সাথে দেখা। মন্দিরে পুজো দিতে এসেছে। হাতে পুজোর ডালা। মূল মন্দির, সমাধিক্ষেত্র, চৈতন্যের খড়ম, দূর্গা মন্দির আর কচি, বালক, যুবক, প্রৌঢ়, বুড়ো সবরকমের বাঁদর দেখে আমরা বাইরে বেরোবো, এমন সময় কেষ্টদা বললেন,

'ওই চোরের পয়েন্টটাই ঠিক।'

'আপনি শিওর ?' বলল লেটুশদা।

'হান্ড্রেড পার্সেন্ট ! যে জায়গায় এমন সাংঘাতিক বাঁদর থাকতে পারে, সেখানে একটা দুটো খুনে চোর থাকা মোটেই আশ্চর্যের নয়।'

 মন্দির থেকে বেরিয়ে আমরা তেষট্টি সাঁইত্রিশ অটোয় উঠব। ঘড়ি বলছে সাড়ে আটটা। আমাদের থানায় যেতে হবে। অটোয় উঠব, সিটের ওপর একটা সাদা কাগজে লেখা, "ফিরে না গেলে বিপদ !"
আমার মাথায় কিছুই আসছে না। আর লেটুশদা যেটা বলল, তাতে মাথা আরও গুলিয়ে গেল।
'বাবা ! মেঘ না চাইতেই জল !'
বলে একটা গোল্ডফ্লেক ধরিয়ে নিশ্চিন্তে খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে তাকিয়ে রইল রাস্তার বাঁদিকের বালির ঢিপিগুলোর দিকে।

(ক্রমশ) 
আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন : 


                                                   

Comments

Popular posts from this blog

আমার বাবা - আমার ছেলেবেলা

                                            দেখতে দেখতে তেইশটা বছর পেরিয়ে গেল – বাবাকে দেখিনি, গল্প করিনি, বাবার আদরের ছোঁয়া পাইনি…… বাবার কথা বলতে গিয়েই প্রথমে মনে পড়ে তাঁর মিষ্টি হাসিটা। আমার বাবা ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। আমার কখনো মনে পড়েনা যে বাবা আমাকে জোর গলায় কিছু বলেছেন বা বকেছেন। ছোটবেলায় আমি আর আমার বোন সঞ্চারী বাবার কাজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতাম – কেন না বাবা ফিরে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ভূতের গল্প শোনাবেন সেই আশায়! কী যে মজার দিন ছিল সেই সব... ছোটবেলায় আমার শখ ছিল পুতুল নিয়ে খেলার, খুব ভালবাসতাম। মনে পড়ে একবার বাবা আর মা বিদেশ থেকে ফেরার  সময় একটা Walkie Talkie Doll (পুতুল) নিয়ে এসেছিলেন। আমি  সেই পুতুলটিকে নিয়ে সারাদিন খেলতাম। একদিন একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে এসেছিল আমাদের বাড়িতে তার বাবামায়ের সাথে আর ওর –ও ঐ পুতুলটিকে খুব ভালো লেগে গেল। আমার নরম মনের বাবা আমাকে বললেন ‘মানা তুমি ওই বাচ্চাটিকে তোমার এই পুতুলটি দিয়ে দাও, আমি তোমাকে আবার...

আমরা তো হেমন্তই হতে চাইতাম

আজও বিকেলে মাঝে মাঝে খুব হেমন্ত শুনতে ইচ্ছে হয়..... "কোনোদিন বলাকারা এতো দূরে যেত কি "...... কিংবা "ওলির কথা শুনে বকুল হাসে ".......আজও মনে পরে "বিষ্ণুপ্রিয়া গো আমি চলে যাই ".......বা "সারাটি দিন ধরে / চেয়ে আছিস ওরে /তোর মনে কথা তবুও কেউ জানলো  না"......আকাশে মেঘ করলেই মনে পরে "মেঘের স্বপন দেখি "......শুধু একজনের জন্য।...... হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । কখনো আবার বেশি রাতে আজও  শুনি বিবিধ ভারতীতে.... "তেরি দুনিয়া মে জিনিসে /তো বেহতর হ্যায় / কে মর যায়ে ".....আর সাথে যদি হয় 'ছুঁপালো যুঁ দিল মে প্যার মেরা " ...তাহলে তো কথাই নেই।   বাবাদের ছেলেবেলায় খুব প্রিয় ছিল " শূর্পনখার নাক কাটা যায় / উই কাটে বই চমত্কার / খদ্দের কে জ্যান্ত ধরে / গলা কাটে দোকানদার "........ মা এখনও  শুনতে চায় "ঘুম যায় ওই চাঁদ মেঘ পরীদের সাথে "......জ্যাঠার ঘরে বসে কত দুপুর কেটেছে শুধু "বসে আছি পথ চেয়ে"........ সেই কোন ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি "যদি জানতে চাও তুমি / এব্যাথা আমার কত টুকু / তবে বন্দি করা কোনো পাখির কাছে জেনে ...

একই সুরে কত গান

বিষয়টা খুব একটা নতুন নয়।  যদিও বেশ আকর্ষণীয়।  গান আমরা প্রায় সকলেই শুনি।  এবং এও জানি যে এমন গান আছে যা শুনলে হঠাৎ করে মনে হয় "আরে   এই গানটার  একটা হিন্দি আছে না?" বা " এই গানটার বাংলা টা  যেন কি?"  এবং এই গানগুলির বিষয়ে মানুষের এক-ধরণের স্বভাবজাত আকর্ষণ ও আছে।  তাই ভাবলাম দেখি কিছু লেখা যায় কিনা।  মজার ব্যাপার সব গান নিয়ে লেখা খুব একটা সহজ নয়।  তবুও চেষ্টা করে দেখতে গেলে ক্ষতি কি।     প্রথমেই আসা যাক সলিল চৌধুরীর গান -এ।  তিনিই এই কাজ প্রথম শুরু করেন বলেই মনে হয়।  না ভুল হলো তার আগে শচীন কর্তাও আছেন।  তবে আগে সলিল চৌধুরীকে  নিয়েই হোক।  লতাজিকে দিয়ে তিনি ৩৫টি বাংলা  আধুনিক  গান গাইয়ে  ছিলেন।  যার ২৯ খানারই অন্য ভার্সন আছে।  ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " গানটির  হিন্দি  ছিল ১৯৬১ সালে প্রকাশিত "মায়া" হিন্দি ছবির " যারে যারে উড় যারে পঞ্চী " . "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " এর উল্টো দিকে ছিল " না যেও না" যার হিন্দি ছিল ১৯৬০ সালে...