লেটুশদার হাতেখড়ি
তৃণাঞ্জয় ভট্টাচাৰ্য
( পর্ব - এক )
'প্রকৃতির কী অদ্ভুত নিয়ম না! জলের মধ্যে যদি ফসফরাস না থাকতো,তাহলে এই অন্ধকার রাত্রে ঢেউগুলো দেখতে পেতি কখনও ?' কথাগুলো বলল লেটুশদা। আমরা গতকাল সন্ধ্যা সাতটার সময় হাওড়া থেকে জগন্নাথ এক্সপ্রেসে পুরীতে এসেছি। আমরা বলতে আমি, লেটুশদা আর আমাদের পাড়ার গ্রসারি কাম স্টেশনারি দোকান "সঞ্চয়িতা"র মালিক কদমকৃষ্ণ বাবু মানে কেষ্টদা। ভদ্রলোক অকৃতদার। বাড়িতে বিধবা পিসি আর তার ছেলে গোবিন্দ থাকে। সেই প্রয়োজনমতো দোকানের কাজে সাহায্য করে। কদমকৃষ্ণবাবু বাইরে গেলে সঞ্চয়িতার দায়িত্ব তখন পুরোপুরি থাকে গোবিন্দর কাঁধে। আমি গোবিন্দকে চিনি। আমাদের বাড়িতে মিনারেল ওয়াটারের বোতল দিতে আসে। ছটফটে মিশুকে স্বভাবের দারুণ ছেলে। তাই কদমকৃষ্ণবাবু যে কোন জায়গায় যাওয়ার কথা শুনলে এককথায় রাজি হয়ে যেতে পারেন। দোকানের কথা ভাবতে হয়না। আমি জয়ন্ত চ্যাটার্জী। জিতু। এখন ক্লাস নাইন। যোধপুর পার্ক বয়েস হাই স্কুল। আমাদের বাড়ি নাকতলায়। নাকতলা শীতলা মন্দিরের পাশের গলিতে। "বসন্ত নিবাস", সতেরো বাই চার এক্সটেন্ডেড নাকতলা রোড। আমার ঠাকুরদাদা বসন্ত চ্যাটার্জী নিজের নামেই বানিয়েছেন এই বাড়ি। আজকের নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির যুগেও আমি কিন্তু ছোটবেলা থেকেই একান্নবর্তী পরিবার দেখে আসছি। ঠাকুরদাদা-ঠাকুমার সময় এই বাড়ি লোকজনে যেন ভরে থাকতো। এখন শুধু আছি আমি, বাবা-মা, শঙ্করদা এবং আমার পিসতুতো দাদা লেটুশদা। আমার পিসিমনি কাবেরী এবং পিসেমশাই জীবনানন্দ সেন থাকেন গৌহাটিতে। নামবাড়ি রেলওয়েস অফিসার্স কলোনিতে। লেটুশদার স্কুলিং ও কলেজ গৌহাটিতে। ও ওর কাজের সুবিধার জন্য কলকাতায় আমাদের সঙ্গে থাকে। ও একটা বড় কোম্পানির বিজনেস কনসাল্টেন্ট। অফিস তারাতলায়। সকাল নটায় বাড়ি থেকে বেরোয়, ফেরে রাত দশটা সাড়ে দশটা।
লেটুশদা। আমার জীবনে যদি একটা কঠিন চয়েস দেওয়া হয়, শুধুমাত্র একজনের সাথে কোনো একটা নির্জন দ্বীপে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে, তাহলে সেই মানুষটি আমার এই পিসতুতো দাদা ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না। ইস্ট লন্ডনের হার্বার্ট বিজনেস স্কুল থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ডিপ্লোমা কমপ্লিট করে চাকরি করছে কর্পোরেট সংস্থায়। কিন্তু হলে কী হবে, লেটুশদার আগ্রহ একটা অদ্ভুত জিনিস নিয়ে। ইনভেস্টিগেশন। না, শশাঙ্ক সেন এখনও নিজেকে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর বলার জায়গায় পৌঁছায়নি। কিন্তু ওর অবসারভেশন অনেক বাঘা বাঘা মানুষের মাথাও ঘুরিয়ে দিতে পারে। সেবার বাঁশদ্রোণী চার্চের পেতনি গুজবের জট মাত্র তিনদিনে ছাড়িয়ে দিয়েছিল লেটুশদা। একটুকরো পড়ে থাকা তুলোর ক্লু ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল দাগি চোরদের। রক্ষা পেয়েছিলেন এক বৃদ্ধা ভিখারিনী। শশাঙ্ক সেন ওর ভালো নাম। বেশিরভাগ লোক ওকে এস.এস বলে ডাকে। এখন এই পর্যন্তই থাক | পুরীর কথা যত এগোবে, ওর সঙ্গে পরিচয় হতে থাকবে সবার।
গরমের ছুটি পড়লেই লেটুশদার সঙ্গে কোথাও না কোথাও বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে আমার। গেল বার সান্দাকফু গিয়েছিলাম। লেটুশদার সঙ্গে ট্রেকিং করতে গিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল একেবারে। মে মাসের শেষে পুরী আসার কথা আমিই বলেছিলাম। প্রথমে ঠিক হয়েছিল বাবা-মাও আসবে। কিন্তু আসার দিন অর্থাৎ বাইশে মে আমরা তিনজনেই এলাম।
আমাদের ফোরবার্থ কম্পার্টমেন্টের একেবারে লোয়ার বার্থে যে ভদ্রলোক ছিলেন তিনি বেশ ছটফটে স্বভাবের। বারবার করে উঠে যাচ্ছেন আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসছেন। লেটুশদা বলল, বোধহয় পরিবারের অন্য লোকজন আলাদা কম্পার্টমেন্টে আছে। পুরী স্টেশনে নামার পরে কদমকৃষ্ণবাবু বললেন,
–'লোকটা বোধহয় মানুষের সাথে মিশতে জানেনা !'
–'সকলেই যে আপনার সাথে গায়ে পড়ে গল্প করতে শুরু করবে, এমনটা ভাবার খুব একটা কোনো কারণ রয়েছে কী ?' বলল লেটুশদা।
কদমকৃষ্ণবাবু অভিযোগের সুরে বললেন, –'না, তবে সন্ধ্যে সাতটা থেকে ভোর সাড়ে চারটে পর্যন্ত যার সঙ্গে সময় কাটালাম, তার নামটা অব্দি জানা হলোনা, সেটাই অবাক লাগছে।'
–'তা জানা যাবে না কেন, ভদ্রলোকের নাম এম. সোম', বলল লেটুশদা।
কদমকৃষ্ণবাবু ভ্রুটা মাথা অব্দি তুলে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি কী করে জানলেন ?'
–'আপনিও পারতেন| যদি কামরার বাইরে আটকানো রিজার্ভেশন চার্টটা লক্ষ্য করতেন।'
বলল লেটুশদা।
জিভ বার করে দাঁত দিয়ে চেপে ধরলেন কদমকৃষ্ণবাবু।
( ক্রমশ )

Comments
Post a Comment