২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাস। বড়দিনের ছুটিতে বেরিয়ে পড়লাম রাজস্থান। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস এয়ারপোর্ট থেকে প্লেনে উঠে সোজা পৌঁছলাম জয়পুর। প্ল্যানটা এভাবে করা হয়েছিল যে জয়পুরে নামবো, কিন্তু জয়পুরে থাকবো না। পরেরদিনই বেরিয়ে যাবো বিকানের-এর পথে। জয়পুর হবে সেই ফেরার সময়।
অগত্যা প্ল্যানমাফিক সেই রাতটা আরটিডিসির হোটেলে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পরেরদিন, বিকানের এর উদ্দেশ্যে। সেই বিকানের, যোধপুর থেকে যাতায়াতে যার দূরত্ব ৩০০ মাইল। কি করে জানলাম? ওই যে মিঃ বর্মন বললেন "সোনার কেল্লা"তে, 'এরপর তো ৩০০ মাইলের ধাক্কা !'
মন্দার বোস : ' ৩০০ মাইল! বিকানের ৩০০ মাইল ? '
মি. বর্মন : ' না মানে যাতায়াত ৩০০ মাইল..।'
মন্দার বোস: 'ওহ্, তাই বলুন'।
এই সেই বিকানের। তাহলে আসল কথাটা বলেই ফেলি। রাজস্থান বেড়াতে যাওয়ার উদ্দেশ্য বা বিধেয় যাই বলুন সব হল গিয়ে ওই সোনার কেল্লা। অনেক বছর ধরে প্ল্যান করে, একটু একটু করে পুঁজি জমিয়ে তবে আমাদের এই "রাজস্থানে রক্তপাত" থুড়ি রাজস্থানের রোমাঞ্চ অনুভব করতে আসা। আরে মশাই বাঙালী হয়ে সোনার কেল্লা দেখবো না, এ কেমন কথা !
তা যাই হোক বিকানের পৌঁছলাম গাড়ীতে সাড়ে চার ঘন্টায়। দিব্যি সুন্দর রাস্তা। নামলাম গিয়ে সোজা বিকানের কেল্লায়। প্রথম রাজস্থানের কেল্লা দেখবো বলে আমাদের আর তর সইছে না। আগেই বলে রাখি যে ক'টা কেল্লা এ যাত্রায় দেখেছি তার মধ্যে এই জুনাগড়ের (বিকানের) কেল্লাকে আমার সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে ভালভাবে সংরক্ষিত বলে মনে হয়েছে। যেমন সুন্দর তার অন্দরের কারুকাজ, তেমনই সুন্দর তার ছাদ আর মেঝে। সেই যে কি সুন্দর মেঝের ওপর দিয়ে ফেলুদারা হেঁটে গিয়েছিল বিকানের কেল্লায়, সেই জায়গায় দাড়িয়ে কি যে অদ্ভুত একটা "থ্রিললল্" অনুভব করছিলাম কি বলবো আপনাদের! সেই ঘরটাও পাওয়া গেল যেখানে জটায়ু ফেলুদাকে মন্দার বোসের গুল্প (গুল + গল্প) বলতে গিয়েও থেমে যান, আর মিঃ বোস ঢোকেন, 'কি কেমন দিলুম ?'
জটায়ু : 'দিলেন... মানে ?'
মন্দার : 'আপনাকে পরীক্ষা করছিলুম বুঝলেন না ! ফুল মার্কস! '
সেই ঘরে দাঁড়িয়ে একবার মনে মনে সংলাপ গুলো আউড়ে নেওয়া গেল। আর যারপরনাই আহ্লাদিত হওয়া গেল! ক্যামেরাও বোধহয় ততক্ষণে ক্লান্ত প্রতিটা ইঞ্চির ছবি তুলতে তুলতে। তারপর কেল্লা দেখে বেরিয়ে সেই জায়গাটা খুঁজে পেতে বার করা গেল যেখানে নকল হাজরার গাড়ী দাঁড়িয়ে ছিল আর মুকুল মুখ ধুচ্ছিল। এসব দেখছি আর নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। এই জায়গায় একদিন রায় সাহেব দাঁড়িয়ে ছিলেন, হয়তো ওইখানে গানটা হচ্ছিল, ' মন মেরা রামনাম রটে ', আজ সেখানে আমি দাড়িয়ে রয়েছি !
যাই হোক সে রাতটা বিকানেরে কাটিয়ে পরের দিন রওনা দেওয়া গেল আমার স্বপ্নের জয়সলমীরের উদ্দেশ্যে। সারা রাস্তা কেটে গেল দুপাশে বালি আর হলুদ পাথর (yellow lime stone) আর, শনিমনসার ঝোপ (আসল নাম যাই হোক...আমি ওই নামেই চিনি)। নাহ শনিবার ছিল না, তাই ফুল ধরাটা আর দেখা গেল না। রাস্তায় গরু ছাগলের মতো উট দেখছি, আর যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি। রাস্তার দিকে চোখ রেখে চলছিলাম, বলা তো যায় না, কোন মন্দার বোস হয়তো আমাদের যাত্রা পন্ড করার জন্য ভাঙা বোতলের টুকরো ছড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু না, অত "ভাল" কপাল নয় আমাদের। কোন অ্যাডভেঞ্চারই জুটলো না কপালে। অগত্যা কি আর করা, গাড়ী শুধু তখন 'চলেছে...চলেছে..'। অবশেষে প্রায় পাঁচ ঘন্টা একটানা চলার পর চোখে পড়লো অনেক দূরে খুব চেনা চেনা একটা কেল্লা। ছোট্টবেলা থেকে দেখে আসছি যেটা, কেল্লা কি সেটা জানারও আগে। মুখ দিয়ে আপনিই বেরোলো, 'সোনা...র কেল্লা', ঠিক যেভাবে মুকুল বলেছিল প্রথম দৃশ্যে। সেদিন বিকেল হয়ে যাওয়াতে আর কেল্লায় যাওয়া হলোনা। দূর থেকে দেখেই খুশী থাকতে হলো।
সন্ধেবেলায় কেল্লায় আলো জ্বলার পর হোটেলের ছাত থেকে মনে হলো যেন স্বপ্নপুরী দেখছি। কাছাকাছি একটা পুতুলনাচের অনুষ্ঠান হয় শুনে সেখানে যাওয়া হলো। সেখানে যে এমন চমক অপেক্ষা করে আছে কে জানতো ! প্রায় একশোর ওপর দর্শককে অনেক কষ্টে বসার জায়গা দিয়ে বৃদ্ধ সঞ্চালক মঞ্চে এসে বললেন, 'আমি সারাজীবন শিক্ষকতা করেছি। এই বয়সে এসে আমার মনে হয়েছে আমাদের নিজেদের স্থানীয় ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা উচিত। তাই এই আয়োজন। কিন্তু এসব কোনকিছুই সম্ভব হতোনা যদি না বাংলা থেকে সত্যজিৎ রায় এখানে কাজ করতে আসতেন। উনি এখানে এসে "গুপী গাইন বাঘা বাইন" এর শ্যুটিং করেন, পরে 'সোনার কেল্লা'র জন্য আবার আসেন। সেই থেকেই জয়সলমীরকে লেকে চিনতে শুরু করে। আমরা চিরকৃতজ্ঞ ওনার কাছে, উনি এখানে না এলে আজ এই দিন আমরা দেখতে পেতাম না।' বাংলায় তর্জমা করলাম, উনি ইংরেজি ও হিন্দীতে বলেছিলেন। মুগ্ধ হয়ে গেলাম ওই বক্তৃতা শুনে। পুতুল নাচ শুরু হল, ভারী সুন্দর নির্দেশনা। রাজস্থানী গানের সঙ্গে ছোট ছোট গল্প অভিনীত হচ্ছে, আর আমি শুধু ভাবছি একটাই নাম, "সত্যজিৎ রায়"। মৃত্যুর এত বছর পরেও একটা সম্পূর্ণ অন্য ভাষার মানুষের কাছে তিনি নিত্য স্মরণীয়। একটা গোটা সম্প্রদায়ের মানুষকে তিনি বাঁচার রাস্তা দেখিয়েছেন। মহাপুরুষ ছাড়া কি ! মূর্তির দরকার নেই, মানুষের মনে তিনি আজও বেঁচে আছেন। সেই সত্যজিতের 'সোনার কেল্লা' আমাকে টেনে এনেছে এই জয়সলমীরের মাটিতে। গর্বিত আর ধন্য মনে হল নিজেকে।
দুপুরে ক্যামেল রাইড , অগত্যা সেই আশ্চর্য জানোয়ারের সামনে যেতেই হ'ল, উঠতে গিয়ে সবার হাল কমবেশি জটায়ুর মতোই হ'ল, কোনোরকমে বসতে পেরে অভ্যাস মতো (নানা জায়গায় বলে থাকি) বলে ফেললাম 'চলিয়ে জী রামদেওরা'... বোঝো ঠ্যালা ! উটচালক ছেলেটি অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে, ভাবছে এরা বলে কি ! কোনমতে হাসি টাসি চেপে তাকে বোঝানো হল যে ওটা তাকে বলা হয়নি। তারপর সেই লম্বা উটসওয়ারি। জটায়ুর মতোই বুঝছিলাম যে কুঁজ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই,বরং একটা কুঁজো থাকলে কাজে দিতো। এরপর উট থেকে নেমে জিপে উঠতে হল। স্যান্ডডিউনস্ ঘোরানো হবে। সে আর এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার ! প্রচন্ড হাওয়ার মধ্যে উঁচু নিচু বালির মধ্যে দিয়ে খুব জোরে জিপ ছোটানো হবে। সোজা হয়ে বসে থাকাটাই চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। যাই হোক হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে অবশেষে জিপ থেকে নামা হল। এরপর গন্তব্য স্যান্ডডিউনস্ এর স্থানীয় নাচ-গান আর নৈশভোজের আসর। সেখানে গিয়েও চমক ! অনুষ্ঠান শুরুর আগে ঘোষণা করা হল, 'সত্যজিৎ রায় যদি জয়সলমীরে এসে সিনেমা না বানাতেন তাহলে আজও আমাদের বাইরে কাজ করতে যেতে হতো, আর জয়সলমীর আজও ধূ ধূ মরুভূমি হয়েই থেকে যেত। আজও এখানে যেসব ট্যুরিস্ট আসেন তাদের সিংহভাগই বাঙালী। তাই বাঙালীদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।' আনন্দে মনটা ভরে গেল। কোন সুদূর রাজস্থানের প্রত্যন্ত জয়সলমীরের মরুভূমিতে প্রতিদিন এক বাঙালীর জয়জয়কার হচ্ছে। আমি গর্বিত আমি বাঙালী। সত্যজিতের জন্মভূমিতে না জন্মালে কি এই বিরাট গর্বের অংশ হতে পারতাম কোনদিন!
বিভিন্ন কসরত যেমন আগুন গেলা, কাঁটা ও ছুরির ওপর নাচ, চোখে সূচ ও ব্লেড নিয়ে নৃত্য পরিবেশন করে দেখালেন স্থানীয় শিল্পীরা। সঙ্গে একের পর এক অসাধারণ লোকগান মিলিয়ে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে ভোজনপর্ব। তাও আবার খাস আরাবল্লীর ডাকাতদের খাদ্য ! ডাল বাটি চুরমা প্রচুর ঘি সহযোগে, গট্টে কি সবজি, নানারকম ডাল, তরকারী,পাঁপড় আর রুটি, "গোল গোল মোটা মোটা"। বেশ অন্যরকম একটা নৈশভোজ সারা হল।
অবশেষে যোধপুর ঘুরে মাউন্ট আবু, উদয়পুর ও রনথমবোরের জঙ্গল ঘুরে আমরা জয়পুর পৌঁছলাম। জয়পুরের প্রধান দ্রষ্টব্য আমের ফোর্ট হলেও আমাদের কাছে বেশি জরুরি ছিল নাহারগড় কেল্লা দেখা। সেই জায়গাটা চিনতে না পারলেও কাছাকাছি যায় এমন কিছু জায়গা দেখলাম। অনেকগুলো বছর কেটে গিয়েছে। ১৯৭৪ এর নাহারগড়ের সাথে আজকের এই জায়গাটার অনেক পার্থক্য। তবু তারই মধ্যে অনেক খুঁজলাম মুকুলকে, মিঃ বোসকে, নকল আর আসল হাজরাকে, পেলাম না। কিন্তু অজস্র স্মৃতি আর ভাললাগা রয়ে গেল মনের মধ্যে। যা নিয়ে অবশেষে ফিরতেই হল কলকাতায়। কি জানি, আমারও বোধহয় গতজন্ম রাজাস্থানেরই কোন গ্রামে হয়েছিল। নাহলে আজ এতগুলো বছর কেটে যাবার পরেও ওই জায়গা গুলোকে ভুলতে পারি না কেন? আবারও যাব কোন একদিন, ঠিক যাব রাজস্থানে, যোধপুরে, জয়সলমীরে, বিকানেরে, নাহারগড়ে। আবার খুঁজবো মুকুলকে। আবার অনেক ভাললাগা নিয়ে ফিরবো। এ জন্মে, কিম্বা হয়তও আগামী জন্মে, কিন্তু যাবই।
স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক
( "মগজাস্ত্র" ই-ম্যাগ প্রথম সংখ্যা থেকে পুনঃপ্রকাশিত )






Comments
Post a Comment