অব্যর্থ এই উক্তি সেদিন শিল্পী কল্যান সেন বরাটের মুখে শোনা
গেল। উপলক্ষ্য ছিল বিশ্বখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক সলিল চৌধুরীর ৯৩ তম
জন্মবার্ষিকী। নন্দন দুইতে অনুষ্ঠিত হলো বিশিষ্ট শিল্পী ও অনুরাগীদের নিয়ে
এক আন্তরিক স্মৃতিসন্ধ্যা। এরপরে নন্দন তিনে সলিল চৌধুরীর পরিচালিত একমাত্র
ছবি “পিঞ্জরে কি পঞ্ছি” প্রদর্শিত হয়।
“রাণার ছুটেছে তাই
ঝুম ঝুম”, “ও মোর ময়না গো”, “আহা ওই আঁকাবাঁকা যে পথ”, “ও ভাই রে ভাই”,
“সুরের এই ঝর ঝর ঝর্ণা”, “হেই সামহালো”, “ওগো আর কিছু তো নাই”, “ধিতাং
ধিতাং বোলে”, “যদি কিছু আমারে শুধাও”, “এই রোকো”, “পাগল হাওয়া”, আরো কত এমন
সব কালজয়ী গান যার সত্যি কোন এক্সপায়ারী ডেট নেই, তার সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে
এক সন্ধ্যার একটি অনুষ্ঠান কখনোই যথেষ্ট নয়। সুর সম্রাটের সুযোগ্যা কন্যা
অন্তরা চৌধুরী বারবার বললেন এই কথা। তিনি উপস্থিত সকলের কাছে আবেদন রাখেন
প্রতিবছর সলিল চৌধুরীর জন্মদিনে যদি তাঁকে নিয়ে উৎসবের আয়োজন করা যায় তাহলে
অনেকেই উপকৃত হবেন, নতুনভাবে জানা যাবে স্রষ্টার বিভিন্ন ধরণের কাজকে, উঠে
আসবে অনেক অজানা কথা। স্বল্প সময়ের অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত ছিলেন বাংলা ছবির
বর্তমান উজ্জ্বলতম নক্ষত্র প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়, বিশিষ্ট চলচ্চিত্র
পরিচালক গৌতম ঘোষ, সঙ্গীত শিল্পী কল্যান সেন বরাট, শ্রীকান্ত আচার্য,
শিবাজি চট্টোপাধ্যায় ও সলিল চৌধুরির এক সময়ের সহকারী স্বপন সেন। অনুষ্ঠান
শুরু হয় সলিল চৌধুরীর প্রতিকৃতিতে মাল্যদানের মাধ্যমে। এরপর মঞ্চে ডেকে
নেওয়া হয় পরিচালক গৌতম ঘোষকে। তিনি প্রথমেই “সলিল চৌধুরী ফাউন্ডেশন অফ
মিউজিক” ও কন্যা অন্তরাকে অভিনন্দন জানান তারা এই মহান সুরস্রষ্টার অনন্য
সৃষ্টিগুলিকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন, যা এদেশে বিরল। আরো বলেন বড় কঠিন
সময়ে সলিল চৌধুরী নিজেকে তৈরী করেছিলেন। মন্বন্তর, বিশ্বযুদ্ধ ও দেশভাগ এই
ত্র্যহস্পর্শ যোগের প্রভাব যাদের ওপর সবচেয়ে বেশী পড়েছিল সেই প্রজন্মের
মানুষ হয়ে সমাজ পাল্টানোর ব্রত নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই পথে নেমেছিলেন স্রষ্টা।
আই পি টি এ আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি যে আদর্শকে পাথেয় করেছিলেন তার দ্বারা
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁকে সিনেমা সম্পর্কে
আগ্রহী করেছিল। পরিচালক তার বক্তব্যে দাবী জানান, রবীন্দ্রসঙ্গীত নজরুলগীতি
দ্বিজেন্দ্রগীতির মতো সলিল চৌধুরীর সৃষ্টিকে “সলিল সঙ্গীত” বলে অভিহিত করা
উচিত। যেভাবে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গীতকে মিলিয়ে দিয়েছেন
অদ্ভুত দক্ষতায়, ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে নানান অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ন করে তাকে
নিজের মতো করে রূপ দিয়েছেন, এ কাজ অসামান্য প্রতিভা ব্যতীত সম্ভব ছিল না।
এরপরে
বক্তব্য রাখতে এসে অভিনেতা প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায় জানান সলিল চৌধুরীকে
তিনি পারিবারির বন্ধু হিসেবে চিনেছেন। তার পিতা অভিনেতা বিশ্বজিত
চট্টোপাধ্যায় এক সময়ে সলিল চৌধুরীর সুরে গান করেছিলেন। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে
এমন কিছু থাকতো যা শুনে আন্দাজ করা যেত যে এ সুর একমাত্র ওঁরই হতে পারে।
সংরক্ষণের ব্যাপারে তিনিও যথেষ্ট গুরুত্ব দিলেন। গায়ক শিবাজি
চট্টোপাধ্যায়ের কাছে জানা গেল যে কোন মনখারাপের আবহকে সলিল চৌধুরী উজ্জীবিত
করে দেবার ক্ষমতা রাখতেন।
বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী কল্যান সেন
বরাট সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করলেন তাঁর মহান কিছু সৃষ্টিকে, যেমন “রাণার”
গানটি বিদেশী সুরের অনুপ্রেরণায় তৈরী, অথচ তাতে কোথাও এমন কোন ভাব নেই যা
বাংলার মাটির গন্ধকে ভুলিয়ে দেয়। আজও যত গান তৈরী হয় তার গায়ে এক্সপায়ারি
ডেট লেখা থাকে, একমাত্র সলিল চৌধুরীর গানে কোন এক্সপায়ারি ডেট থাকে না।
শিল্পী
স্বপন সেন জানালেন বহু গানে তিনি সলিল চৌধুরীর সহকারী হিসেবে ছিলেন।
একমাত্র সলিল চৌধুরীর সঙ্গে রেকর্ডিং থাকলে আলাদাভাবে রেওয়াজের প্রয়োজন
হতো। সবশেষে সুন্দর এক গল্পের মাধ্যমে মঞ্চে এসে স্মৃতিচারণ করে গেলেন আর
এক প্রথিতযশা শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য। তার কলেজ জীবনের কিছু ঘটনা যার
মাধ্যমে তিনি সলিল চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখেছিলেন তা তার স্বভাবসিদ্ধ সরস
ভঙ্গিতে উপস্থাপন করলেন শিল্পী।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল
“পিঞ্জরে কি পঞ্ছি” ছবির প্রদর্শন। ১৯৬৬ সালে তৈরী বলরাজ সাহানি, মেহমুদ ও
মিনা কুমারী অভিনীত অন্য ধরণের এই ছবিতে দুই অপরাধীর জীবন নিয়ে গল্প
এগিয়েছে। বহুদিন আগের এই ছবি বড় পর্দায় দেখতে পাওয়া বিরল অভিজ্ঞতা। সমগ্র
অনুষ্ঠানটির দায়িত্বে ও সহযোগিতায় ছিলেন “সলিল চৌধুরী ফাউন্ডেশন অফ মিউজিক”
ও নন্দন কর্তৃপক্ষ।
স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক



Comments
Post a Comment