Skip to main content

ডায়েরীর পাতায়



28.09.2017                                                                                                                            01:45a.m



অ্যাই বন্ধু, কেমন আছো? তোমার সাথে পাক্কা পঁচিশ ঘন্টা পর দেখা। জানো আজ একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হলো। আচ্ছা, তুমি সুপার হিরোতে বিশ্বাসী? আজ কিন্তু আমি সত্যিই সুপার হিরো দেখলাম। কি নিশ্চয়ই ভাবছো তিস্তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তা ভাবতেই পারো, ক্ষতি নেই। 

তোমায় তো বলেই ছিলাম, যে মহাসপ্তমীর বিকেলটা মেসের বন্ধুদের সাথে কাটাবো, প‍্যাণ্ডেলে-প‍্যাণ্ডেলে ঘুরবো, হাবিজাবি খাবো, আর অনেক অনেক মজা করবো। বুঝতেই তো পারছো, বালুড়ঘাটের চৌহদ্দির বাইরে প্রথম পা রাখা, তাও আবার তিলোত্তমা কলকাতার দুর্গাপূজো দেখা। উফ্, উত্তেজনায় ঠিক করে ঘুমাতেই পারিনি। 

অবশেষে গেলাম ঠাকুর দেখতে, দারুণ সব প‍্যাণ্ডেল, সোনায় মোড়া প্রতিমা, কত্তসব থিম, আমি তো আমি, আমার কলকাতার বন্ধুরাও অবাক হয়ে দেখছে। আমি মফঃস্বলের মেয়ে, এরকম ও যে পূজো হয়, ধারণাই ছিল না। 

কিন্তু আমার সব আনন্দের মধ‍্যেও একটা খোঁচা থাকেই। কেননা, ভগবান আমার কপালে নির্ভেজাল, বিশুদ্ধ আনন্দ তো লেখেননি। তবে, এটা ঠিক, ভাগ‍্যিস ওই খোঁচাটুকু ছিল, তাই সুপার হিরোর দেখা পেলাম। 

কলকাতার পুজোয় দারুণ আনন্দ হয় জানতাম, কিন্তু কলকাতার পুজোয় এমন নিদারুণ ভীড় হয়, বিশ্বাস করো বন্ধু এতোটাও আন্দাজ করতে পারিনি। ভীড় বলে ভীঢ়! আমাদের গোটা বালুড়ঘাটের লোক যদি একটা প‍্যাণ্ডেলে ঢুকে যায় তাহলেও বোধহয় এমন অবস্থা হবেনা। 

বন্ধুদের কাছেই শুনলাম, উদয়ন সংঘের ঠাকুর নাকি এবার “সেরার সেরা” পুরস্কার পেয়েছে। ঠিক হলো, সেখানেই যাবো। মেট্রোতে উঠলাম। স্টেশনে মেট্রো ঢোকার সাথে সাথেই যা দেখলাম, কি বলবো বন্ধু, কাতারে কাতারে লোক। রণমত্ত হস্তীর মতো মেট্রো থেকে নামলাম। তারপর ভীড় অনুসরণ করে উদয়ন সংঘে যখন পৌঁছলাম খেয়াল করলাম আমার পাশে আমার বন্ধুরা নেই। শুধু চারপাশে কালো কালো মাথা। ভীড়ের চাপে কে যে কোথায় ছিটকে গেছি জানিনা। ভয়ের কোনো কারণ ছিল না, কেননা মুঠোফোনটা ব‍্যাগেই, কিন্তু মফঃস্বলের আমি, কলকাতার ভিড়ঠাসা প‍্যাণ্ডেলে নিজেকে হঠাৎই একা আবিষ্কার করে কেন জানি না, খুব দুর্বল লাগছিলো, গলার কাছটা শুকিয়ে গিয়ে প্রায় দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো ক্রমশ। মনে হচ্ছিল আমার চারপাশের পৃথিবীটা দুলছে। উগ্ৰ একটা পারফিউমের গন্ধে গা গুলিয়ে উঠছিলো। এক্ষুনি, এইমুহূর্তে ভীড় থেকে বেরোতে না পারলে দমবন্ধ হয়ে মরেই যাবো হয়তো। 

ঠিক তখনই একটা শক্ত পুরুষালী হাত আমার কাঁধটা ধরে উল্টো দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকলো। তার মুখ দেখার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। সে আমার পেছনেই ছিল। পিছন ফিরে দেখার জন্য যে শক্তিটা দরকার, সেটাও বোধহয় ছিল না তখন। শুধু তার কন্ঠস্বর আমার কানে বাজছিল, “এই তো, এসে গেছি, আর একটুখানি। কিচ্ছু হবে না আপনার।“  এই কন্ঠস্বর আগে শুনিনি। পরিচিত কারোর যে নয়, তা জানি। কিন্তু ওই কন্ঠস্বরকে ভরসা করা যায়। অন্য হাতটি দিয়ে ভীড় ঠেলতে থাকলো সে। তারপর প‍্যাণ্ডেলের বাইরে বার করে আনলো সে। 

স্বেচ্ছাসেবকদের একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে কোথায় যে উধাও হয়ে গেল, দেখতে পেলাম না। তারপর ছুটতে ছুটতে এসে আমার দিকে একটা জলের বোতল এগিয়ে দিলো। তখনই আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। নায়কসুলভ মুখ হয়তো তার নয়, কিন্তু চোখদুটো দেখলে মানুষটিকে বিশ্বাস করতে আর কোন দ্বিধা থাকে না। আচ্ছা, কারোর চোখে কিভাবে এতটা প্রশান্তি থাকে, যা উল্টোদিকের মানুষকেও এক লহমায় শান্ত করতে পারে!

“আপনার সাথে কেউ এসেছে? আচ্ছা, একটু সুস্থ লাগছে?” আবার তাকালাম, একটু উদ্বিগ্ন মনে হলো যেন। 

“আমি ঠিক আছি, আমার বন্ধুরা আছে আশেপাশেই” আমি বললাম। 

“আপনার কাছে মোবাইল আছে তো?”

আমি তাকে নিশ্চিন্ত করলাম। তারপর সুপার হিরো চলে গেল। আমি তাকে ধন্যবাদ ও জানাতে পারিনি। সেই আফসোসটা রয়েই গেছে। জানো বন্ধু, ভালো-খারাপের হিসেবটা বড়ো জটিল। তার সবটুকুই দুয়ে দুয়ে চার হয়না। আবার কখনো দেখা যায়, দিনের শেষে সবটাই ফাঁকি। পৃথিবীতে সব ভালোটা মরে যায়নি। কিছুটা বেঁচে আছে এখনও, তাই হয়তো স্বপ্নগুলো জেগে ওঠে। আমাদের এই রাজনীতি আর ধর্ষনের দেশে যে সুপার হিরোর অস্তিত্ব ও আছে আজ থেকে সেটা ভেবে গর্বিত হবো। তার চাউনিতে অশ্লীলতা ছিলনা, আর তার হাতদুটো এগিয়ে এসেছিল শুধু মাত্র আমায় বাঁচানোর জন‍্যই। যেভাবে হঠাৎ এসেছিল, সেভাবেই চলে গেল। শুধু রেখে গেল, অনেকটা ভালো লাগা, আর অনেকটা গর্ব। তুমি ভালো থেকো সুপার হিরো। আর তোমার ভালোয় আলো হয়ে উঠুক চারপাশ। Thank you so much.  

Happy puja.







- Poulami Chakraborty



Comments

Popular posts from this blog

আমার বাবা - আমার ছেলেবেলা

                                            দেখতে দেখতে তেইশটা বছর পেরিয়ে গেল – বাবাকে দেখিনি, গল্প করিনি, বাবার আদরের ছোঁয়া পাইনি…… বাবার কথা বলতে গিয়েই প্রথমে মনে পড়ে তাঁর মিষ্টি হাসিটা। আমার বাবা ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। আমার কখনো মনে পড়েনা যে বাবা আমাকে জোর গলায় কিছু বলেছেন বা বকেছেন। ছোটবেলায় আমি আর আমার বোন সঞ্চারী বাবার কাজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতাম – কেন না বাবা ফিরে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ভূতের গল্প শোনাবেন সেই আশায়! কী যে মজার দিন ছিল সেই সব... ছোটবেলায় আমার শখ ছিল পুতুল নিয়ে খেলার, খুব ভালবাসতাম। মনে পড়ে একবার বাবা আর মা বিদেশ থেকে ফেরার  সময় একটা Walkie Talkie Doll (পুতুল) নিয়ে এসেছিলেন। আমি  সেই পুতুলটিকে নিয়ে সারাদিন খেলতাম। একদিন একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে এসেছিল আমাদের বাড়িতে তার বাবামায়ের সাথে আর ওর –ও ঐ পুতুলটিকে খুব ভালো লেগে গেল। আমার নরম মনের বাবা আমাকে বললেন ‘মানা তুমি ওই বাচ্চাটিকে তোমার এই পুতুলটি দিয়ে দাও, আমি তোমাকে আবার...

আমরা তো হেমন্তই হতে চাইতাম

আজও বিকেলে মাঝে মাঝে খুব হেমন্ত শুনতে ইচ্ছে হয়..... "কোনোদিন বলাকারা এতো দূরে যেত কি "...... কিংবা "ওলির কথা শুনে বকুল হাসে ".......আজও মনে পরে "বিষ্ণুপ্রিয়া গো আমি চলে যাই ".......বা "সারাটি দিন ধরে / চেয়ে আছিস ওরে /তোর মনে কথা তবুও কেউ জানলো  না"......আকাশে মেঘ করলেই মনে পরে "মেঘের স্বপন দেখি "......শুধু একজনের জন্য।...... হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । কখনো আবার বেশি রাতে আজও  শুনি বিবিধ ভারতীতে.... "তেরি দুনিয়া মে জিনিসে /তো বেহতর হ্যায় / কে মর যায়ে ".....আর সাথে যদি হয় 'ছুঁপালো যুঁ দিল মে প্যার মেরা " ...তাহলে তো কথাই নেই।   বাবাদের ছেলেবেলায় খুব প্রিয় ছিল " শূর্পনখার নাক কাটা যায় / উই কাটে বই চমত্কার / খদ্দের কে জ্যান্ত ধরে / গলা কাটে দোকানদার "........ মা এখনও  শুনতে চায় "ঘুম যায় ওই চাঁদ মেঘ পরীদের সাথে "......জ্যাঠার ঘরে বসে কত দুপুর কেটেছে শুধু "বসে আছি পথ চেয়ে"........ সেই কোন ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি "যদি জানতে চাও তুমি / এব্যাথা আমার কত টুকু / তবে বন্দি করা কোনো পাখির কাছে জেনে ...

একই সুরে কত গান

বিষয়টা খুব একটা নতুন নয়।  যদিও বেশ আকর্ষণীয়।  গান আমরা প্রায় সকলেই শুনি।  এবং এও জানি যে এমন গান আছে যা শুনলে হঠাৎ করে মনে হয় "আরে   এই গানটার  একটা হিন্দি আছে না?" বা " এই গানটার বাংলা টা  যেন কি?"  এবং এই গানগুলির বিষয়ে মানুষের এক-ধরণের স্বভাবজাত আকর্ষণ ও আছে।  তাই ভাবলাম দেখি কিছু লেখা যায় কিনা।  মজার ব্যাপার সব গান নিয়ে লেখা খুব একটা সহজ নয়।  তবুও চেষ্টা করে দেখতে গেলে ক্ষতি কি।     প্রথমেই আসা যাক সলিল চৌধুরীর গান -এ।  তিনিই এই কাজ প্রথম শুরু করেন বলেই মনে হয়।  না ভুল হলো তার আগে শচীন কর্তাও আছেন।  তবে আগে সলিল চৌধুরীকে  নিয়েই হোক।  লতাজিকে দিয়ে তিনি ৩৫টি বাংলা  আধুনিক  গান গাইয়ে  ছিলেন।  যার ২৯ খানারই অন্য ভার্সন আছে।  ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " গানটির  হিন্দি  ছিল ১৯৬১ সালে প্রকাশিত "মায়া" হিন্দি ছবির " যারে যারে উড় যারে পঞ্চী " . "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " এর উল্টো দিকে ছিল " না যেও না" যার হিন্দি ছিল ১৯৬০ সালে...