Skip to main content

যখন তুমি অনেক দূরে..


'দিল আজ শায়র হ্যায়
গম আজ নাগমা হ্যায়.......... ' গানটার শেষ লাইনটা ছিল ' হম যব না হোঙ্গে তো রো রো কে দুনিয়া ঢুঁঢেঁগি মেরে নিশা '
সত্যিই তাই |
তুমি চলে গেছো, কোথাও নেই তুমি, তবু তুমি আছো,আমাদের সংগীত-জীবনে তুমি আছো |
তবুও সবাই তোমার চিহ্নই খুঁজে বেড়াই সবার মধ্যে |
তুমি আমাদের কিশোর কুমার |
প্রথম যেবার পুরী বেড়াতে যাই বাবা মায়ের সঙ্গে তখন তোমার বোধহয় নতুন গানের এলবাম বেরিযেছিল। তখন তো গান শোনার অবলম্বন বলতে বাড়িতে রেডিও বা ট্রানজিস্টর আর কালো কালো গোল গোল রেকর্ড আর মাইক | মনে আছে এতবছর পরেও পুরী হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে শোনা, ' আকাশ কেন ডাকে ', ' আমার মনের এই ময়ূর-মহলে ', ' একদিন পাখি যাবে উড়ে ' | , কান দিয়ে মনে গেঁথে গেছিল | গানের তখন কিছুই বুঝিনা, বাবা মায়ের ভালো লাগাটাই ভালো লাগা, তবু মনে জায়গা করে নিয়ে ছিল তোমার গানগুলো |
এরপর এক দূর্গাপূজোতে শুনলুম তিনটে গান ,' দুখি মন মেরে, শুন মেরা কেহনা ' , ' চিঙ্গারী কোই ভড়কে ' আর ' ও সাম কুছ আজীব থি ',এক অন্য অনুভূতিতে ভেসে গেলুম |
দেওঘর বেড়াতে গিয়ে যে হোটেলটায় ছিলুম, তার ছাদ থেকে নন্দনপাহাড়ের মাথায় পাম্পিং-স্টেশনের আলো দেখা যেত। তখন আমার সঙ্গী নিজের লিরিল সাবানের মতো দেখতে ফিলিপসের ছোট ট্রানজিস্টর। রাতে নেপাল ধরত তাতে শুনলুম ' মেরে ন্যায়না শাওন-ভাদো ' উফ্ পাগল হ'য়ে গেলুম। কি গলার জোর, কি সুন্দর গান | দুরের পাহাড়ের মাথার আলোটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে গানটা গিলতুম মন দিয়ে |
আরেকটি গান মনে আছে এমনই পরিস্থিতিতে মনে জায়গা করে নিল, এবারের স্থান দীঘা, হোটেল সি-হকের বারান্দায় ' মুসাফির হুঁ ইয়ারো ' পেছনে টাঙ্গার শব্দের মতো মিউজিক |
কত গান গেয়েছো তুমি, তার চেয়েও অবাক হই কতরকমের গান গেয়েছো | সুখ, দুঃখ, লারেলাপ্পা, গজল এমনকি ভজনও |
পূজোর সময় প্যান্ডেলের কাপড়ের নতুন গন্ধের সঙ্গে তোমার গাওয়া ' শীতল শীতল পরের কথা ' , ' চেয়েছি যারে আমি ' , ' আকাশপথে প্রেম করেছি ' , ' সেদিনও আকাশে ছিল কত তারা ' , ' হাওয়া মেঘ সরায়ে ' , ' যে কথা মনের কথা ' আরও কত |
এবার এলো প্রেমে পরার বয়স, বয়স না সময় | তাতে তোমারই গাওয়া গান আগুনে ঘি দিলো। অনুরাগের ছোঁয়া, অমরসঙ্গী, গুরু কাঁপিয়ে দিল | ছোটবেলা থেকে এখনও এবং ভবিষ্যতেও কিশোর কুমারের গানই ভালো লাগার, ভালোবাসার আরেক নাম |
আমি নেই, ভাবতেই ব্যাথায় ব্যাথায় মন ভরে যায়,  এই গানটা যখনই শুনি তখন অনুভব করি সত্যিই স্মৃতি হয়ে শুধু আছো, ছবি হয়ে রয়ে গেছো |
তোমার দীপ নেভানো রাত এখনো বুকে বাজে |
যখন তুমি অনেক দূরে, থাকলে না আর মাটির ঘরে এখনও তোমায় পড়ে মনে আগের মতন ক'রে, এ আমার মনের কথা।
সত্যজিৎ রায়ের মতো মানুষও বলতে বাধ্য হয়েছেন অমন গলা আর ছিল না |
গান শেখা বলতে দাদামনি ( অশোক কুমার) | ছোটবেলায় গলা খুব খারাপ ছিল, একদিন বঁটিতে পায়ের আঙুল কেটে যায়, সারাদিন ধরে চিৎকার করে কেঁদে ছিল ছোট্ট আভাস। ব্যাস গলা খুলে গেল | সেই গানের পথে চলা শুরু | উনি নেই কিন্ত উনি স্বমহিমায় আছেন আমাদের মধ্যে |
টাকা-পয়সার ব্যাপারে খুবই হিসেবি ছিলেন, একমাত্র রাজেশ খান্নার ছবিতে গানের জন্য ১ টাকা নিতেন | রাজেশ জী-র সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল |
একবার কোনো ছবির গান রেকর্ডিং হওয়ার পরে, ওঁকে টাকা দিতে ভুলে গেছে, বাইরে বেড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট করে গোঁ গোঁ শব্দ করেই যাচ্ছেন।কি ব্যাপার, তখন মনে পড়ল এই রে পেমেন্ট দেওয়া হয়নি, পেমেন্ট পেয়ে কিশোরদা চলে গেল | মুড ভালো থাকলে জামা প্যান্ট পড়ে স্টুডিওতে আসতেন আর যেদিন দেখা যেত লুঙ্গি আর ফতুয়া পড়ে এসেছেন তখন সবাই বুঝে যেত মুড খারাপ |
আঁধি সিনেমার গান রেকর্ডিং হচ্ছে, লতাজীর সঙ্গে, তেরে বিনা জিন্দেগী সে, কিশোরদা রুমে ঢুকে সবার সঙ্গে ঠাট্টা ইয়ার্কি করেই চলেছেন, গানের জায়গাতে কিছুতেই আসছেন না। লতাজীও শেষদিকে বিরক্ত হ'য়ে বলেছিলেন, দাদা পেহলে গানা তো গায়িয়ে  | ব্যাস হঠাৎ ভীষণ সিরিয়াস হয়ে ঢুকে একবারে পুরো গানটা নামিয়ে দিলেন |
যে গান পছন্দ নয় অথচ সেটাই গাইতে হবে, এমন পরিস্থিতিতে স্টুডিওতে ঢুকতেন এক কাল্পনিক বাচ্চার হাত ধরে, নিজেই দুটো গলায় বাবা ছেলের কথোপকথন করতে করতে গানের মাঝে বুঝিয়ে দিতেন, গানটা ভালো নয় বা মনঃপুত নয় |
লতাজী তখন নতুন ইন্ডাস্ট্রিতে, ট্রেনে আসা-যাওয়া করতেন। একদিন ট্রেন থেকে নেমে দেখেন, একজন অপরিচিত লোক ওঁকে অনুসরণ করছেন। যেদিকে লতাজী যাচ্ছেন পেছন পেছন সেই লোকটিও। লতাজী ভয় পেলেন খুব। কোনোরকমে স্টুডিওতে ঢুকে নালিশ করলেন, " ইয়ে আদমি মেরা পিছা কর রাহা হ্যায় |"
পরিচালক হেসে ফেললেন, " আরে ও তো কিশোর, তোমার সঙ্গে ডুয়েট গাইবে |" স্টুডিও চিনতেন না ব'লে লতাজীর পেছন পেছন যাচ্ছিলেন | এমন প্রচুর ঘটনা আছে, বলে শেষ করা যাবে না |

কিশোর কুমার এক versatile চরিত্র যেমন তার গায়কি |

আমাদের এই ভালোবাসা তোমার গানের পুরষ্কার।

যাওয়ার আগে জানিয়ে গেলাম তোমার প্রতি নমষ্কার |

দু-চোখে দেখিনা তোমায়।

তবু আছো।

তুমি আছো |

চিরকালের কিশোর কুমার |

গুঞ্জন ববি গাঙ্গুলি



Comments

Popular posts from this blog

আমার বাবা - আমার ছেলেবেলা

                                            দেখতে দেখতে তেইশটা বছর পেরিয়ে গেল – বাবাকে দেখিনি, গল্প করিনি, বাবার আদরের ছোঁয়া পাইনি…… বাবার কথা বলতে গিয়েই প্রথমে মনে পড়ে তাঁর মিষ্টি হাসিটা। আমার বাবা ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। আমার কখনো মনে পড়েনা যে বাবা আমাকে জোর গলায় কিছু বলেছেন বা বকেছেন। ছোটবেলায় আমি আর আমার বোন সঞ্চারী বাবার কাজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতাম – কেন না বাবা ফিরে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ভূতের গল্প শোনাবেন সেই আশায়! কী যে মজার দিন ছিল সেই সব... ছোটবেলায় আমার শখ ছিল পুতুল নিয়ে খেলার, খুব ভালবাসতাম। মনে পড়ে একবার বাবা আর মা বিদেশ থেকে ফেরার  সময় একটা Walkie Talkie Doll (পুতুল) নিয়ে এসেছিলেন। আমি  সেই পুতুলটিকে নিয়ে সারাদিন খেলতাম। একদিন একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে এসেছিল আমাদের বাড়িতে তার বাবামায়ের সাথে আর ওর –ও ঐ পুতুলটিকে খুব ভালো লেগে গেল। আমার নরম মনের বাবা আমাকে বললেন ‘মানা তুমি ওই বাচ্চাটিকে তোমার এই পুতুলটি দিয়ে দাও, আমি তোমাকে আবার...

আমরা তো হেমন্তই হতে চাইতাম

আজও বিকেলে মাঝে মাঝে খুব হেমন্ত শুনতে ইচ্ছে হয়..... "কোনোদিন বলাকারা এতো দূরে যেত কি "...... কিংবা "ওলির কথা শুনে বকুল হাসে ".......আজও মনে পরে "বিষ্ণুপ্রিয়া গো আমি চলে যাই ".......বা "সারাটি দিন ধরে / চেয়ে আছিস ওরে /তোর মনে কথা তবুও কেউ জানলো  না"......আকাশে মেঘ করলেই মনে পরে "মেঘের স্বপন দেখি "......শুধু একজনের জন্য।...... হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । কখনো আবার বেশি রাতে আজও  শুনি বিবিধ ভারতীতে.... "তেরি দুনিয়া মে জিনিসে /তো বেহতর হ্যায় / কে মর যায়ে ".....আর সাথে যদি হয় 'ছুঁপালো যুঁ দিল মে প্যার মেরা " ...তাহলে তো কথাই নেই।   বাবাদের ছেলেবেলায় খুব প্রিয় ছিল " শূর্পনখার নাক কাটা যায় / উই কাটে বই চমত্কার / খদ্দের কে জ্যান্ত ধরে / গলা কাটে দোকানদার "........ মা এখনও  শুনতে চায় "ঘুম যায় ওই চাঁদ মেঘ পরীদের সাথে "......জ্যাঠার ঘরে বসে কত দুপুর কেটেছে শুধু "বসে আছি পথ চেয়ে"........ সেই কোন ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি "যদি জানতে চাও তুমি / এব্যাথা আমার কত টুকু / তবে বন্দি করা কোনো পাখির কাছে জেনে ...

একই সুরে কত গান

বিষয়টা খুব একটা নতুন নয়।  যদিও বেশ আকর্ষণীয়।  গান আমরা প্রায় সকলেই শুনি।  এবং এও জানি যে এমন গান আছে যা শুনলে হঠাৎ করে মনে হয় "আরে   এই গানটার  একটা হিন্দি আছে না?" বা " এই গানটার বাংলা টা  যেন কি?"  এবং এই গানগুলির বিষয়ে মানুষের এক-ধরণের স্বভাবজাত আকর্ষণ ও আছে।  তাই ভাবলাম দেখি কিছু লেখা যায় কিনা।  মজার ব্যাপার সব গান নিয়ে লেখা খুব একটা সহজ নয়।  তবুও চেষ্টা করে দেখতে গেলে ক্ষতি কি।     প্রথমেই আসা যাক সলিল চৌধুরীর গান -এ।  তিনিই এই কাজ প্রথম শুরু করেন বলেই মনে হয়।  না ভুল হলো তার আগে শচীন কর্তাও আছেন।  তবে আগে সলিল চৌধুরীকে  নিয়েই হোক।  লতাজিকে দিয়ে তিনি ৩৫টি বাংলা  আধুনিক  গান গাইয়ে  ছিলেন।  যার ২৯ খানারই অন্য ভার্সন আছে।  ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " গানটির  হিন্দি  ছিল ১৯৬১ সালে প্রকাশিত "মায়া" হিন্দি ছবির " যারে যারে উড় যারে পঞ্চী " . "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " এর উল্টো দিকে ছিল " না যেও না" যার হিন্দি ছিল ১৯৬০ সালে...