Skip to main content

সর্বোত্তম উত্তম




উত্তমকুমার নায়ক, মহানায়ক কিন্তু তার থেকেও বড়ো ব্যাপার হলো, আমার মতে তিনি মানুষের উত্তম সবার উত্তম। সেই সময় একজন মা ভাবতেন, আমার যদি এমন একটি ছেলে থাকত। একজন বোন বা ভাইও ভাবতো, আহা এমন যদি আমার একটি দাদা থাকত। দিদি বা দাদারা ভাবতো এমন একটি ভাইয়ের কথা আর সর্বোপরি আপামর বঙ্গনারী তাঁকে স্বামীর ভাবনায় হৃদয়ে স্থান দিতো। তাই তাঁর মহাপ্রয়াণের পরে বহু বঙ্গনারী সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলেছিলেন, ট্রেন চালক ট্রেন থামিয়ে দিয়েছিলেন এবং গ্রামের নার্সারি থেকে নিউমার্কেটে আগত সমস্ত ফুল ঢেলে দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপন করা হয়েছিল মহানায়ককে। 


আমার ব্যক্তিগত মত অনুযায়ী এমন অভিনেতা এমন মানুষ সারা পৃথিবীতে এই একজনই এসেছিলেন ( সব নায়কের প্রতি সম্মান জানিয়েই বলছি )। খুঁটিয়ে দেখতে গেলে তিনি যে দারুণ সুন্দর ছিলেন তা বলবো না। বসন্ত চৌধুরী, প্রদীপ কুমার, সৌমিত্র অনেক বেশি সুন্দর। কিন্তু তা সত্বেও পর্দা জুড়ে শুধুই উত্তমের উপস্থিতি বাকি সবাইয়ের চেয়ে অনেক যোজন এগিয়ে।


চিরকাল একনিষ্ঠ মোহনবাগানী ছিলেন উত্তমকুমার। তাঁকে নিয়ে লেখা তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও শেষ হয়ে যায় নি, যাবেও না। একটা শোনা ঘটনা বলি, 

খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তনের পরে জনৈক খুঁতখুঁতে দর্শক বোধহয় উল্টোরথে লিখেছিলেন রাইচরণের চোখ বৃদ্ধ বয়সে বেশ উজ্জল, সেই দর্শকেরই পরের জিজ্ঞাস্য লালপাথরে উত্তম বৃদ্ধবয়সের ঐ ঘোলাটে চাহনি আনলেন কি করে?


আমার যতটুকু মনে পড়ে প্রথম উত্তমকুমারকে বুঝে দেখা সিনেমা "থানা থেকে আসছি"। এক জায়গাতে দাঁড়িয়ে অমন করে তিনকড়ি হালদারের চরিত্র ফুটিয়ে তোলা সত্যি অবাক করে দিয়েছিল। তারপর চমকে যাই "জীবন-মৃত্যু", "বনপলাশীর পদাবলি", "সবার উপরে", "কুহক", "বিভাস", "সপ্তপদী" ( মাইলস্টোন) , "বিচারক", "রাজা সাজা", "শেষ অঙ্ক", "হারানো সুর", "মরুতীর্থ হিংলাজ", "জতুগৃহ", "নিশীপদ্ম", "রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্ত", "চিড়িয়াখানা" আর "নায়ক" দেখে।


মায়ের কাছে শুনেছি সত্যজিৎ রায় "নায়ক" তৈরীর পর বলেছিলেন 'আমি আমার কাজে খুঁত পেলেও উত্তমের কাজে কোনো খুঁত পাইনি'। রোমান্টিক সিনেমার মধ্যে "নায়িকা সংবাদ", "শুধু একটি বছর", "দেয়া-নেয়া", "চাওয়া-পাওয়া", "ইন্দ্রাণী" সবই এত প্রিয় যে কোনটা ছেড়ে কোনটার নাম নেবো? মজার ছবিগুলোর মধ্যে "ধন্যি মেয়ে", "মৌচাক", "ভ্রান্তিবিলাস", "সাড়ে চুয়াত্তর", "ছদ্মবেশী" এগুলোর কথা শুরু করলে লিখে শেষ করা যাবে না।

কোনো এক ম্যাগাজিনে পড়েছিলুম একবার কোনো ছবির শ্যুটিংয়ের সেট-এ নিজের কাজের শেষে বাথরুমে গেছিলেন তিনি। ফিরে আসার সময় দেখেন ছবির পরিচালক ওর রুমে ঢুকে সোনার হার আংটি ঘড়ি পকটস্থ করছেন। ওঁর চাকর বলেন চলুন ধরি, উত্তম হেসে বলেছিলেন কখনোই না, উনি নামি পরিচালক। হয়তো অভাবে পড়ে এটা করে ফেলেছেন, লোক জানাজানি হলে উনি লজ্জায় পড়ে যাবেন। এমন অনেক কীর্তি আছে মানুষ উত্তমকুমারের।


প্রতিদিনে প্রতিক্ষণে প্রতিমুহুর্তে উনি আছেন বাঙালির মনে হৃদয়ে, মজার ব্যাপার এখনো নাকি টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় কেউ ভালো অভিনয় করলে "উফ্ যেন উত্তমকুমার  শুনতে হয়। বম্বের ডাকসাইটে অভিনেতা রাজেশ খান্না অমর-প্রেম করার পরে স্বীকার করেছিলেন, 'ছবিটা করার আগে অজস্রবার "নিশিপদ্ম" দেখেছি তাও ফুটিয়ে তুলতে পারিনি নিজেকে উত্তমবাবুর মতো।'


আমার সৌভাগ্য হয়নি ওঁকে সামনাসামনি দেখার। বাবা দেখেছিল হুগলীর উত্তরপাড়ায় গৌরী সিনেমা হলে কোনো একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। বাবা এখনো বলে যেন রাজপুত্র! সবকিছু ছাপিয়ে আমার সবচেয়ে পছন্দের হলো উত্তমকুমারের আপাদমস্তক বাঙালীয়ানাটা।

ওটাই যেন বড়ো বেশি আপন করে নেয় প্রিয় মহানায়ককে, উত্তমকুমারকে।


গুঞ্জন ববি গাঙ্গুলী



Comments

Popular posts from this blog

আমার বাবা - আমার ছেলেবেলা

                                            দেখতে দেখতে তেইশটা বছর পেরিয়ে গেল – বাবাকে দেখিনি, গল্প করিনি, বাবার আদরের ছোঁয়া পাইনি…… বাবার কথা বলতে গিয়েই প্রথমে মনে পড়ে তাঁর মিষ্টি হাসিটা। আমার বাবা ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। আমার কখনো মনে পড়েনা যে বাবা আমাকে জোর গলায় কিছু বলেছেন বা বকেছেন। ছোটবেলায় আমি আর আমার বোন সঞ্চারী বাবার কাজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতাম – কেন না বাবা ফিরে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ভূতের গল্প শোনাবেন সেই আশায়! কী যে মজার দিন ছিল সেই সব... ছোটবেলায় আমার শখ ছিল পুতুল নিয়ে খেলার, খুব ভালবাসতাম। মনে পড়ে একবার বাবা আর মা বিদেশ থেকে ফেরার  সময় একটা Walkie Talkie Doll (পুতুল) নিয়ে এসেছিলেন। আমি  সেই পুতুলটিকে নিয়ে সারাদিন খেলতাম। একদিন একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে এসেছিল আমাদের বাড়িতে তার বাবামায়ের সাথে আর ওর –ও ঐ পুতুলটিকে খুব ভালো লেগে গেল। আমার নরম মনের বাবা আমাকে বললেন ‘মানা তুমি ওই বাচ্চাটিকে তোমার এই পুতুলটি দিয়ে দাও, আমি তোমাকে আবার...

আমরা তো হেমন্তই হতে চাইতাম

আজও বিকেলে মাঝে মাঝে খুব হেমন্ত শুনতে ইচ্ছে হয়..... "কোনোদিন বলাকারা এতো দূরে যেত কি "...... কিংবা "ওলির কথা শুনে বকুল হাসে ".......আজও মনে পরে "বিষ্ণুপ্রিয়া গো আমি চলে যাই ".......বা "সারাটি দিন ধরে / চেয়ে আছিস ওরে /তোর মনে কথা তবুও কেউ জানলো  না"......আকাশে মেঘ করলেই মনে পরে "মেঘের স্বপন দেখি "......শুধু একজনের জন্য।...... হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । কখনো আবার বেশি রাতে আজও  শুনি বিবিধ ভারতীতে.... "তেরি দুনিয়া মে জিনিসে /তো বেহতর হ্যায় / কে মর যায়ে ".....আর সাথে যদি হয় 'ছুঁপালো যুঁ দিল মে প্যার মেরা " ...তাহলে তো কথাই নেই।   বাবাদের ছেলেবেলায় খুব প্রিয় ছিল " শূর্পনখার নাক কাটা যায় / উই কাটে বই চমত্কার / খদ্দের কে জ্যান্ত ধরে / গলা কাটে দোকানদার "........ মা এখনও  শুনতে চায় "ঘুম যায় ওই চাঁদ মেঘ পরীদের সাথে "......জ্যাঠার ঘরে বসে কত দুপুর কেটেছে শুধু "বসে আছি পথ চেয়ে"........ সেই কোন ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি "যদি জানতে চাও তুমি / এব্যাথা আমার কত টুকু / তবে বন্দি করা কোনো পাখির কাছে জেনে ...

একই সুরে কত গান

বিষয়টা খুব একটা নতুন নয়।  যদিও বেশ আকর্ষণীয়।  গান আমরা প্রায় সকলেই শুনি।  এবং এও জানি যে এমন গান আছে যা শুনলে হঠাৎ করে মনে হয় "আরে   এই গানটার  একটা হিন্দি আছে না?" বা " এই গানটার বাংলা টা  যেন কি?"  এবং এই গানগুলির বিষয়ে মানুষের এক-ধরণের স্বভাবজাত আকর্ষণ ও আছে।  তাই ভাবলাম দেখি কিছু লেখা যায় কিনা।  মজার ব্যাপার সব গান নিয়ে লেখা খুব একটা সহজ নয়।  তবুও চেষ্টা করে দেখতে গেলে ক্ষতি কি।     প্রথমেই আসা যাক সলিল চৌধুরীর গান -এ।  তিনিই এই কাজ প্রথম শুরু করেন বলেই মনে হয়।  না ভুল হলো তার আগে শচীন কর্তাও আছেন।  তবে আগে সলিল চৌধুরীকে  নিয়েই হোক।  লতাজিকে দিয়ে তিনি ৩৫টি বাংলা  আধুনিক  গান গাইয়ে  ছিলেন।  যার ২৯ খানারই অন্য ভার্সন আছে।  ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " গানটির  হিন্দি  ছিল ১৯৬১ সালে প্রকাশিত "মায়া" হিন্দি ছবির " যারে যারে উড় যারে পঞ্চী " . "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " এর উল্টো দিকে ছিল " না যেও না" যার হিন্দি ছিল ১৯৬০ সালে...