Skip to main content

মনোহরি সিং : সেই বাঁশি ওয়ালা

“কাশ্মীর কি কলি” ছবির সেই সিকোয়েন্সটা মনে পড়ে? শাম্মী কাপুর “বার”এ গাইছেন একটি দুঃখের গান; ও পি নায়ারের সুরে মহঃ রফির অসামান্য গায়কী আর সাথে নেপথ্যে বাজছে মন মাতানো একটি Saxophone। মনে আছে সেই  “হ্যায় দুনিয়া উসিকি, জমানা উসিকা” গানটির কথা? বা শঙ্কর জয়কিষণের সুরে “আজীব দাস্তান হ্যায় ইয়ে”? “স্যাড সং” এও অনবদ্য সেই Saxophone !
এই সবের পেছনেই ছিলেন এই প্রতিভাবান মানুষটি! তাঁর বাজানো যন্ত্রেই আমরা মুগ্ধ হয়েছি বারবার- সেই ১৯৫৮ থেকে ২০১০ সাল অবধি।

খাস কলকাতার লোক- কাজ করতেন একটি মিলিটারি ব্যান্ডে। তারপর তৎকালীন বিখ্যাত রেস্তোরাঁ “ফারপো” তে যোগ দেন; সেখানে উনি Saxophone বাজাতেন। সেখানেই আলাপ সলিল চৌধুরীর সাথে, যিনি মুগ্ধ হন বাজনা শুনে। সলিলের সাহায্যেই পাড়ি দেন বোম্বাই।

বোম্বাইয়ে প্রথম কাজের সুযোগ দেন শচীন কর্তা। তাঁর “সিঁতারো সে আগে” (১৯৫৮)ছবিতেই প্রথম বাজানোর সুযোগ পান মনোহারি সিং। কিন্তু সে ছবির গান তেমন চলেনি, তাই সেভাবে কেউ জানতে পারলো না এই প্রতিভার আগমনের কথা। তবে চোখে পড়েছিলেন কল্যাণজীর; উনি তখন উঠতি সুরকার (আনন্দজী যোগ দেন পরে)। “সাট্টা বাজার” (১৯৫৯) ছবিতে মনোহারিকে সুযোগ দিলেন কল্যাণজী; Saxophone নির্ভর সেই গান আজও জনপ্রিয়, হেমন্ত- লতার কণ্ঠে- “তুমহে ইয়াদ হোগা কভি হম মিলে থে”।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ডেকে নিলেন তখনকার সেরা সঙ্গীত পরিচালকরা। শঙ্কর জয়কিষণ, মদনমোহন, ও. পি. নায়ার, সলিল চৌধুরী, রোশন, চিত্রগুপ্ত, রবি- সবার সাথে বাজাতে শুরু করলেন মনোহারি। কিছু গানে তো ওনার বাজানো Saxophone হয়ে উঠল প্রধান আকর্ষণ।
এরপর ১৯৬১ তে সঙ্গীত জগতে পা রাখলেন রাহুল দেববর্মণ। আগে থেকেই মনোহারির সাথে গভীর বন্ধুত্ব ছিল তাঁর; শচীন কর্তার সাথে এক সাথেই কাজ করেছেন দুজনেই। রাহুলের প্রথম ছবিতে সহকারীর ভুমিকা পালন করেন লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল। সেটা ছিলি ১৯৬১ সাল, ছবির নাম ছিল “ছোটে নবাব”। এরপর ১৯৬৩ থেকে লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল স্বাধীনভাবে সঙ্গীত পরিচালনার কাজ শুরু করেন এবং খুব দ্রুত চলে আসেন প্রথম সারিতে। ওনাদের গ্রুপেও Saxophone বাজাতেন মনোহারি। তবে কোনও প্রথম সারির সুরকারই কিন্তু সহকারী বা arranger হিসেবে তখনও মনোহারিকে নেননি; সবাই ওনাকে ব্যবহার করেছেন একজন বাদক হিসেবেই- কখনও Saxophone, কখনও বাঁশী, কখনও তারসানাই।
১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ অবধি আর কাজ পাননি রাহুল দেববর্মণ। ১৯৬৫ তে পেলেন “ভুত বাংলা” এবং “তিসরা কৌন” ছবির কাজ। Arranger এবং সহকারী হিসেবে উনি বেছে নিলেন মনোহারিকেই। শুরু হল হিন্দি ছবির গানের জগতে এক “নতুন বিপ্লব”।

তখন শঙ্কর জয়কিষণের রাজত্ব চলছে; ওনারা যে ছবিতে কাজ করছেন- তারই সব গান সুপারহিট। ওদিকে মনোহারিও ওঁদের দলেরই একজন সদস্য। কিন্তু arranger হিসেবে নিজেকে উজাড় করে দিলেন মনোহারি। ১৯৬৬ তে “তিসরি মঞ্জিল” ছবিতে আমরা উপহার পেলাম একেবারে নতুন ধরণের গান- যা আগে কখনও হয়নি! এরপর পরপর “বাহারোঁ কে সপনে”, “চন্দন কা পালনা”, “পড়োসান”, “ওয়ারিস”, “পেয়ার কা মৌসম”, “কটি পতঙ্গ”, “অমর প্রেম”, “কারবাঁ”এই তালিকা শেষ হবার নয়! মাঝে আবার এল কর্তার “আরাধনা” (১৯৬৯)- যা বদলে দিল অনেক ইতিহাস। শঙ্কর জয়কিষণ এবং মহঃ রফির পতন, কিশোর কুমারের উত্থান- নতুন ইতিহাস তৈরি করল এই ছবি- যার সঙ্গীতের পেছনে রাহুল বা মনোহারির অবদান কম নয়।

রাহুল- মনোহারি জুটির সাফল্যের কথা সবাই জানেন। ১৯৯৪ অবধি চলেছিল এই জুটির রাজত্ব, শেষ হয়েছিল রাহুলের প্রয়াণে। ২৯০টির ওপর ছবি- প্রায় সবই সুপারহিট গানের জন্য বিখ্যাত! আর কোনও সুরকার/ অ্যারেঞ্জারের এই সাফল্য নেই! বিভিন্ন এবং বিচিত্র রকম যন্ত্রের ব্যবহার, নানারকম এক্সপেরিমেন্ট- সব ধরণের গান তৈরি করে আপামর জনগণের মন কেড়েছিলেন এই জুটি।

একই সাথে কাজ করে গেছেন অন্যান্য সুরকারদের সাথেও- বাজিয়ে গেছেন বিভিন্ন রকম বাদ্যযন্ত্র। সেখানেও তিনি ছিলেন অপরিহার্য। ৬০-এর দশকের শেষ থেকেই ওনাকে অ্যারেঞ্জার হিসেবে ডেকে নেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং নৌশাদও। ওদিকে স্বপন জগমোহন আর ভুপেন হাজারিকার অ্যারেঞ্জারও ছিলেন তিনিই। তাছাড়া বাসুদেব চক্রবর্তীর সাথে মিলে “বাসু মনোহারি” নামে সুর করেছেন কিছু ছবিতে, যার মধ্যে “সবসে বড়া রুপাইয়া” ছিল সুপারহিট গানের ছবি। মনে পড়ে লতা- কিশোরের সেই মন মাতানো ডুয়েট?- “ওয়াদা করো জানম, না ছোড়োগে ইয়ে দামন”। কিছু অসাধারণ বাংলা গানও সৃষ্টি করে গেছেন এঁরা; তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- “তার চোখে নেমে আসা” (মহঃ রফি), “তোমাদের আশীর্বাদের এই শতদল মাথায় রাখি” (মহঃ রফি), “মন জানালা খুলে দে না” (কিশোর কুমার)ইত্যাদি।

পরিশেষে কিছু গানের উল্লেখ করা যাক, যেখানে আমরা এই অসামান্য প্রতিভাবান লোকটির প্রতিভার পরিচয় পেয়েছি। এই সব গানে তাঁর বাজানো বাদ্য যন্ত্রই ছিল মুখ্য।

১) আজীব দাস্তান হ্যায় ইয়ে (শঙ্কর জয়কিষণ)
২)  যা রে উড় যা রে পনছি/ যা রে উড়ে যা রে পাখি (সলিল চৌধুরী)
৩) বেদরদী বালমা তুঝকো (শঙ্কর জয়কিষণ)
8) হুজুরেওয়ালা জো হো ইজাজত (ও পি নায়ার)
৫) ও হনসিনি (রাহুল দেব বর্মণ)
৬) ম্যায় আয়া হু (লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল)
৭) আনেওয়ালা পল জানেওয়ালা হ্যায় (রাহুল দেব বর্মণ)
৮) তার আর পর নেই (নচিকেতা ঘোষ)
৯) এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে (নচিকেতা ঘোষ)
১০) তুম বিন জাউ কাহাঁ (রাহুল দেব বর্মণ)--- এখানে উনি Mandolin বাজিয়েছিলেন


কৌশিক মৈত্র


Comments

Popular posts from this blog

আমার বাবা - আমার ছেলেবেলা

                                            দেখতে দেখতে তেইশটা বছর পেরিয়ে গেল – বাবাকে দেখিনি, গল্প করিনি, বাবার আদরের ছোঁয়া পাইনি…… বাবার কথা বলতে গিয়েই প্রথমে মনে পড়ে তাঁর মিষ্টি হাসিটা। আমার বাবা ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। আমার কখনো মনে পড়েনা যে বাবা আমাকে জোর গলায় কিছু বলেছেন বা বকেছেন। ছোটবেলায় আমি আর আমার বোন সঞ্চারী বাবার কাজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতাম – কেন না বাবা ফিরে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ভূতের গল্প শোনাবেন সেই আশায়! কী যে মজার দিন ছিল সেই সব... ছোটবেলায় আমার শখ ছিল পুতুল নিয়ে খেলার, খুব ভালবাসতাম। মনে পড়ে একবার বাবা আর মা বিদেশ থেকে ফেরার  সময় একটা Walkie Talkie Doll (পুতুল) নিয়ে এসেছিলেন। আমি  সেই পুতুলটিকে নিয়ে সারাদিন খেলতাম। একদিন একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে এসেছিল আমাদের বাড়িতে তার বাবামায়ের সাথে আর ওর –ও ঐ পুতুলটিকে খুব ভালো লেগে গেল। আমার নরম মনের বাবা আমাকে বললেন ‘মানা তুমি ওই বাচ্চাটিকে তোমার এই পুতুলটি দিয়ে দাও, আমি তোমাকে আবার...

আমরা তো হেমন্তই হতে চাইতাম

আজও বিকেলে মাঝে মাঝে খুব হেমন্ত শুনতে ইচ্ছে হয়..... "কোনোদিন বলাকারা এতো দূরে যেত কি "...... কিংবা "ওলির কথা শুনে বকুল হাসে ".......আজও মনে পরে "বিষ্ণুপ্রিয়া গো আমি চলে যাই ".......বা "সারাটি দিন ধরে / চেয়ে আছিস ওরে /তোর মনে কথা তবুও কেউ জানলো  না"......আকাশে মেঘ করলেই মনে পরে "মেঘের স্বপন দেখি "......শুধু একজনের জন্য।...... হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । কখনো আবার বেশি রাতে আজও  শুনি বিবিধ ভারতীতে.... "তেরি দুনিয়া মে জিনিসে /তো বেহতর হ্যায় / কে মর যায়ে ".....আর সাথে যদি হয় 'ছুঁপালো যুঁ দিল মে প্যার মেরা " ...তাহলে তো কথাই নেই।   বাবাদের ছেলেবেলায় খুব প্রিয় ছিল " শূর্পনখার নাক কাটা যায় / উই কাটে বই চমত্কার / খদ্দের কে জ্যান্ত ধরে / গলা কাটে দোকানদার "........ মা এখনও  শুনতে চায় "ঘুম যায় ওই চাঁদ মেঘ পরীদের সাথে "......জ্যাঠার ঘরে বসে কত দুপুর কেটেছে শুধু "বসে আছি পথ চেয়ে"........ সেই কোন ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি "যদি জানতে চাও তুমি / এব্যাথা আমার কত টুকু / তবে বন্দি করা কোনো পাখির কাছে জেনে ...

একই সুরে কত গান

বিষয়টা খুব একটা নতুন নয়।  যদিও বেশ আকর্ষণীয়।  গান আমরা প্রায় সকলেই শুনি।  এবং এও জানি যে এমন গান আছে যা শুনলে হঠাৎ করে মনে হয় "আরে   এই গানটার  একটা হিন্দি আছে না?" বা " এই গানটার বাংলা টা  যেন কি?"  এবং এই গানগুলির বিষয়ে মানুষের এক-ধরণের স্বভাবজাত আকর্ষণ ও আছে।  তাই ভাবলাম দেখি কিছু লেখা যায় কিনা।  মজার ব্যাপার সব গান নিয়ে লেখা খুব একটা সহজ নয়।  তবুও চেষ্টা করে দেখতে গেলে ক্ষতি কি।     প্রথমেই আসা যাক সলিল চৌধুরীর গান -এ।  তিনিই এই কাজ প্রথম শুরু করেন বলেই মনে হয়।  না ভুল হলো তার আগে শচীন কর্তাও আছেন।  তবে আগে সলিল চৌধুরীকে  নিয়েই হোক।  লতাজিকে দিয়ে তিনি ৩৫টি বাংলা  আধুনিক  গান গাইয়ে  ছিলেন।  যার ২৯ খানারই অন্য ভার্সন আছে।  ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " গানটির  হিন্দি  ছিল ১৯৬১ সালে প্রকাশিত "মায়া" হিন্দি ছবির " যারে যারে উড় যারে পঞ্চী " . "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " এর উল্টো দিকে ছিল " না যেও না" যার হিন্দি ছিল ১৯৬০ সালে...