Skip to main content
আমাদের সকলের, যাদের নিজেদের বাড়ি আছে, তাদের সকলের একটা খুব প্রিয় জায়গা হলো বাড়ির ছাদ। হ্যাঁ। হতে পারে নেড়া , হতে পারে ঘেরা, হতে পারে বাহারি রেলিং দেওয়া অথবা ইঁটের পাঁজা বের করা। তবু সেটা একটা খুব স্পেশাল জায়গা। ছাদ যখন আছে, সেই ছাদের কিছু একান্ত নিজস্ব গোপন গল্প ও রয়েছে নিশ্চই। যেগুলো বাড়ির আনাচ-কানাচ ঠিক ততটা ভালো করে জানেনা। কি সেই গল্প?
শুরু করা যাক ছোটবেলা থেকে, প্রথম ঘুড়ি ওড়ানো কোথায় শেখা? প্রথম আচার-চুরি? প্রথম পুতুলখেলা-খেলনাবাটির সংসার? প্রথম বড়ি দেওয়া? প্রথম আমসত্ত্ব খাওয়া? সঅঅঅঅব ছাদে। সেই যে সেবার, বাবার হাত ধরে ভো-কাট্টা করে দিয়েছিলেন আর ৫টা বাড়ি পরে থাকা কাল্টু দের? মনে পড়ে? সে কি চেঁচামেচি বলুন? আর মাঞ্জা দেওয়া? কাঁচের গুঁড়োয় হাত কেটে যাওয়া? কি মার টাই না খেতেন মায়ের কাছে। এসবের সময় কিন্তু ছাদ চুপ করে আপনার দাপাদাপি সহ্য করতো। কিছুটি বলতো না। তারপর ধরুন শীতকালে, ওহঃ সে এক দিন ছিল মশাই বলুন? সারি সারি বড়ি দিয়ে আপনার ঠাম্মা বা দিদা বসে থাকতো লাঠি হাতে, "কাক"-তাড়ুয়া হয়ে, আপনি তখন কম ভয় পেতেন সেই লাঠিকে? তবু কিন্তু এদিক ওদিক সময় পেলেই আপনি চাকুম-চুকুম করে আচারের বয়াম থেকে আঙ্গুল ঢুকিয়ে খেয়ে নিতেন চুপিচুপি। ছাদ কিন্তু সঅঅঅঅব দেখতো। কখনো কিন্তু ঠাম্মা কে বলেনি। সব গল্প চেপে গেছে চুপচাপ। কি ভালো না?
আরেকটু বড় হতেই আপনার শখ জাগলো ক্রিকেট খেলবেন। পাড়ার বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে এনে সে কি ব্যাটবলের হুরুদ্দুম পিটানি। আর ছাদ যদি বড় সড় হয় তো কথা ই নেই। আপনাকে তখন আর পায় কে? এছাড়াও ভাবুন, কালিপুজোয় বাজি ফাটানো। মনে আছে? লংকাপটকা, সাপবাজি, চকলেট ব্যোম কিছু আর বাকি নেই বলুন? ওহঃ তুবড়ি। সেই এত্ত বাজির ধুলো-ধোঁয়া, মোমবাতি পোড়া, জ্বলে আধা নিভে যাওয়া রংমশাল সব ওই ছাদেই পড়ে থাকতো সকাল পর্যন্ত। হয়তো ছাদের বুক জ্বলত। কিন্তু আপনি তখন সেসব কি আর খেয়াল করতেন?
এরপর যখন আরো বড় হলেন, তখন তো আপনার সমস্ত সিক্রেট ওই ছাদেই বন্দি থাকতো। কি কি করেন নি বলুন তো? দুরুদুরু বুকে যখন প্রথম বার আপনি মিতালি কে বাড়িতে আনলেন, সেই যে সেই প্রথম চুমু, বাড়ির লোকের থেকে লুকিয়ে ছাদেই তো হয়েছিল! তারপর ঘন্টার পর ঘন্টা ছাদে পায়চারি, আর ফোনের ওপারে থাকা মানুষের রাগ, অভিমান, দুঃখ, কান্না, আবেগ, ভালোবাসা র সব স্রোত একাই সামলানো, চাড্ডিখানি কথা নাকি বলুন? দুপুরে উঠে সাধের চুমকি বৌদি কে লুকিয়ে দেখা, আঃ সেকি দারুন আনন্দের সে কি আর বউ বুঝবে? যখন কিনা, ভরদুপুরে বৌদি কাপড় জামা তুলে শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে চিলেকোঠা বেয়ে নেমে যেত আপনি বুঝি সেসব কিছুই দেখেন নি? না না, আরে লজ্জা পাচ্ছেন কেন মশাই!! আসলে সব ই ওই ছাদের দেয়াল গুলো চোখ বুজে দেখে গেছে, থুড়ি অনুভব করছে কিন্তু কাউকে বলেনি। এই আর কি। তারপর আরো বড় হয়ে যখন প্রায় বুড়ো হতে চললেন (ওই মধ্য-তিরিশের কোঠায় আর কি) তখন বউকে লুকিয়ে ছাদ এ দাঁড়িয়ে উপর থেকে নিচে তাকিয়ে কম মেয়ে দেখেছেন বলুন? সত্যি করে বলুন তো!
তাই বলি কি, এই যে ছাদ টা, আপনাকে এত্ত রকম ভাবে সাহায্য করলো, জায়গা দিলো আপনার প্রাইভেট স্পেসের, ছোটবেলা থেকে আপনার সব দাপাদাপি হুটোপাটি সামলে রাখলো, আপনার গোপন গল্প লুকিয়ে রাখলো, তাকে মাঝেমধ্যে একটু যত্ন করবেন! এই যেমন ধরুন, শুকনো পাতা-কাঠকুটো ঝড়ে উড়ে এলে বা বৃষ্টির জমা জলে নোংরা হয়ে গেলে একটু পরিষ্কার করে রাখবেন সময়মতো। তাহলে দেখবেন, আপনার যখন খুব কষ্ট হবে, মনের দুঃখ কাউকে বলতে পারবেন না, চিৎকার করে লুকিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করবে... তখন ওই ছাদ ই আপনার সব কথা অন্ধকারে একলা চুপ করে শুনবে। জানেনই তো... "দেওয়ালের ও কান আছে"!!!

© কাশ্মীরা দাস

Comments

  1. অসাধারণ লেগেছে দিদিভাই ; ত্রস্ত জীবনে শান্তির কোণের সত্য বলে দিলে....

    ReplyDelete
  2. বাস্তবতা কে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন, আর স্মৃতি গুলো হটাৎ জেগে উঠেছে।।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

আমার বাবা - আমার ছেলেবেলা

                                            দেখতে দেখতে তেইশটা বছর পেরিয়ে গেল – বাবাকে দেখিনি, গল্প করিনি, বাবার আদরের ছোঁয়া পাইনি…… বাবার কথা বলতে গিয়েই প্রথমে মনে পড়ে তাঁর মিষ্টি হাসিটা। আমার বাবা ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। আমার কখনো মনে পড়েনা যে বাবা আমাকে জোর গলায় কিছু বলেছেন বা বকেছেন। ছোটবেলায় আমি আর আমার বোন সঞ্চারী বাবার কাজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতাম – কেন না বাবা ফিরে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ভূতের গল্প শোনাবেন সেই আশায়! কী যে মজার দিন ছিল সেই সব... ছোটবেলায় আমার শখ ছিল পুতুল নিয়ে খেলার, খুব ভালবাসতাম। মনে পড়ে একবার বাবা আর মা বিদেশ থেকে ফেরার  সময় একটা Walkie Talkie Doll (পুতুল) নিয়ে এসেছিলেন। আমি  সেই পুতুলটিকে নিয়ে সারাদিন খেলতাম। একদিন একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে এসেছিল আমাদের বাড়িতে তার বাবামায়ের সাথে আর ওর –ও ঐ পুতুলটিকে খুব ভালো লেগে গেল। আমার নরম মনের বাবা আমাকে বললেন ‘মানা তুমি ওই বাচ্চাটিকে তোমার এই পুতুলটি দিয়ে দাও, আমি তোমাকে আবার...

আমরা তো হেমন্তই হতে চাইতাম

আজও বিকেলে মাঝে মাঝে খুব হেমন্ত শুনতে ইচ্ছে হয়..... "কোনোদিন বলাকারা এতো দূরে যেত কি "...... কিংবা "ওলির কথা শুনে বকুল হাসে ".......আজও মনে পরে "বিষ্ণুপ্রিয়া গো আমি চলে যাই ".......বা "সারাটি দিন ধরে / চেয়ে আছিস ওরে /তোর মনে কথা তবুও কেউ জানলো  না"......আকাশে মেঘ করলেই মনে পরে "মেঘের স্বপন দেখি "......শুধু একজনের জন্য।...... হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । কখনো আবার বেশি রাতে আজও  শুনি বিবিধ ভারতীতে.... "তেরি দুনিয়া মে জিনিসে /তো বেহতর হ্যায় / কে মর যায়ে ".....আর সাথে যদি হয় 'ছুঁপালো যুঁ দিল মে প্যার মেরা " ...তাহলে তো কথাই নেই।   বাবাদের ছেলেবেলায় খুব প্রিয় ছিল " শূর্পনখার নাক কাটা যায় / উই কাটে বই চমত্কার / খদ্দের কে জ্যান্ত ধরে / গলা কাটে দোকানদার "........ মা এখনও  শুনতে চায় "ঘুম যায় ওই চাঁদ মেঘ পরীদের সাথে "......জ্যাঠার ঘরে বসে কত দুপুর কেটেছে শুধু "বসে আছি পথ চেয়ে"........ সেই কোন ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি "যদি জানতে চাও তুমি / এব্যাথা আমার কত টুকু / তবে বন্দি করা কোনো পাখির কাছে জেনে ...

একই সুরে কত গান

বিষয়টা খুব একটা নতুন নয়।  যদিও বেশ আকর্ষণীয়।  গান আমরা প্রায় সকলেই শুনি।  এবং এও জানি যে এমন গান আছে যা শুনলে হঠাৎ করে মনে হয় "আরে   এই গানটার  একটা হিন্দি আছে না?" বা " এই গানটার বাংলা টা  যেন কি?"  এবং এই গানগুলির বিষয়ে মানুষের এক-ধরণের স্বভাবজাত আকর্ষণ ও আছে।  তাই ভাবলাম দেখি কিছু লেখা যায় কিনা।  মজার ব্যাপার সব গান নিয়ে লেখা খুব একটা সহজ নয়।  তবুও চেষ্টা করে দেখতে গেলে ক্ষতি কি।     প্রথমেই আসা যাক সলিল চৌধুরীর গান -এ।  তিনিই এই কাজ প্রথম শুরু করেন বলেই মনে হয়।  না ভুল হলো তার আগে শচীন কর্তাও আছেন।  তবে আগে সলিল চৌধুরীকে  নিয়েই হোক।  লতাজিকে দিয়ে তিনি ৩৫টি বাংলা  আধুনিক  গান গাইয়ে  ছিলেন।  যার ২৯ খানারই অন্য ভার্সন আছে।  ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " গানটির  হিন্দি  ছিল ১৯৬১ সালে প্রকাশিত "মায়া" হিন্দি ছবির " যারে যারে উড় যারে পঞ্চী " . "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " এর উল্টো দিকে ছিল " না যেও না" যার হিন্দি ছিল ১৯৬০ সালে...