Skip to main content

ডুয়ার্সের_ডায়েরী_থেকে

শেষ সকালে বনের গন্ধে যেন হঠাৎ চারদিক ভরে গেল, কটেজের পেছন দিকে একটা পরিখা মতো কাটা, আর সামনের দিকে যতদূর চোখ যায় চা-বাগানের সারি সারি গুল্ম গাছ। এই কটেজের কথা এক পরিচিতের মুখে খবর পাই আমরা।

পরিখার পেছনে একটা ঝোরা ছিল। ঝর ঝর শব্দ রাতে ঘর থেকে শোনা যেত, কি স্বচ্ছ জল, আমি কি জানি ওকে দেখেই নাম দিয়েছিলাম অলকানন্দা-- ওর ঘর খুঁজে না পেয়ে মনে হয়েছিল ও স্বর্গ থেকে নেমেছে।  একদম স্লিম, ব্রাউন শিফন পরে, যার পাড় অদ্ভুত সবুজ রঙের-- ঝোরার ধারে মস্ত এক চ্যাটালো কালো পাথর, ওই পাথরে বসেই নিজেকে রাজাসনে বসে আছি মনে হচ্ছিল! শুতেও ইচ্ছা করেছে কিন্তু শুতে ভরসা পাইনি, সাপ ছিল - নেহাত শীত বলে তারা আমায় মায়া করেছে আর কি!! ঝোরার পাশেই ছিল শুখখা আর ছররা ঘাসের বন, তাদের ফেলেই এক সাইজের বড় বড় শাল সেগুনদের ভিড় আর ছিল অনেক রাবার গাছ, আর ছিল অনেক নাম না জানা সাদা লম্বা লম্বা গাছ তাদের গায়ে রোদ পড়ে মনে হচ্ছে যেন ফেসপ্যাক মাখা। কাঁচপোকাদের ভারি ভিড়, শীতে তাদের পাখা তিরতির করে কাঁপছে যেন! ভোরে, বেলায় অপরাহ্নে জঙ্গলের সৌন্দর্য এক এক রকমের।

এক টুরিস্ট ভদ্রলোক গলায় বিশাল নলওয়ালা ক্যামেরা নিয়ে ছোটাছুটি করছিলেন, আমি হাতির খোঁজে ঝোরার ওপারের রাস্তায় তখন,  আমার কন্যে কিছুদূর গিয়ে কয়েকটা বনময়ূর দেখেই ভয়ে সারা। পাগলি মায়ের উপর ভরসা রাখতে না পেরে কটেজে হাঁটা দিল আমাকে অনেক সাবধানবাণী ও বাবার ভয় দেখিয়ে, কিন্তু আমি ফেরার জন্যে গেছি রে ভাই? মাঠ ভর্তি হলুদ পাতায় ভর্তি নাম না জানা বুনো পাতলা লাল ফুল, অনেকটা আমাদের কাশফুলের মতো।

ভদ্রলোক অনেকক্ষণ দেখে যখন দেখলেন আমি সেই পাথরে গ্যাঁট হয়ে বসে গেছি, বাধ্য হয়ে বললেন, "কাল কিন্তু এদিকে হাতি বেরিয়েছিল, দেখুন ধানক্ষেতে কত বড় বড় পা!"
মধুর হেসে বললাম তাহলে তো না দেখে যাওয়াই নেই।
ভদ্রলোক বললেন, "এদিকে তো কেউ নেই, আপনি কিন্তু একদম একা!"
ওনাকে আশ্বস্ত করে বললাম "কোন কোন সময় একাই থাকতে হয়,  আপনি যান।"

হাতি বড় নির্দয়, আসেনি তখন, এলো রাতে।  সেও এক পাওয়া-- সে গল্প আলাদা। কটেজে একটা বার্ডস হাব করা ছিল, পাখীরা চান করার জন্যে, গরমকালে দলে দলে এসে ভিড় করে এরা, হুপুস হাপুস করে চান করে, এখন অনেক কম, শীতে চান লাগে না তো! কেবল একদল আছে, ঠেলাঠেলি করে, তাদের ঝগড়ুটে পাখি বলে। এরা লালচে ঠোঁটের হয়, কিছু আদেখলা ক্যামেরা নিয়ে এত পেছনে পড়ে গেল যে এরাও পোকার মায়া ত্যাগ করেই উড়ে গেলো। কত কি যে দেখার ছিল, আগুন আবিষ্কার আর জঙ্গল আবিষ্কার সমান উত্তেজনার মনে হয়।

রাতের বেলা সেই ক্যামেরাওয়ালা ভদ্রলোক বাড়ির কত্তাকে ধরে বললেন, "আপনার স্ত্রী কিন্তু খুবই নেচার লাভার মনে হলো",
কত্তা হেসে বললেন, "উনি যা দেখছেন তাতেই সুন্দর দেখে পাগল হয়ে যাচ্ছেন, নিজে পাগল হলে তো সব ই পাগল দেখায়।"

আমার বড় কন্যা হা হা করে উঠল, আমার পাগলামি এরা হাড়েমাসে জানে, কি জানি ভদ্রলোক নির্মল মজা বুঝতে পারলেন কিনা!! আমার মনে হল তিনিও আমার মতোই আর এক পাগল হয়তো!

শেষরাতে জঙ্গলের গায়ে আদিম গন্ধ জড়ানো থাকে যেন, সেই গন্ধ হয়ত নাম না জানা বুনো ফুলের, পাতার,  রাত চরা পাখির কিন্তু সেই গন্ধে আবিষ্ট হয়ে থাকে মন বুদ্ধির আধার, পেছনে বয়ে চলা ঝোরার অবিরাম প্রস্তরখন্ডিত শব্দ শুধু নৈ:শব্দ কে ভাঙে! শুখখা আর ছররা ঘাসের পথ পেরিয়ে ঝোরার পেছনে ঘন শাল আর নাম না জানা বড় বড় গাছের বন ক্রমশ মিশেছে গোরুমারা ফরেস্ট রেঞ্জের সাথে,  ভোর রাতে সেদিকের ঘন অন্ধকারে তাকালে কেমন মিস্টিক লাগে,  তার পেছনে ভূটান পাহাড় -- এই পাহাডের রং কাঞ্চনের মত সোনাঝরা নয়, গম্ভীর কালোt সামনে গেলে কিছু অংশ মাত্র সাদা দেখায়। গভীর জঙ্গল পেরিয়ে গেলে পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝামাঝি অংশতে  কিছুটা আলোকিত, সেই আবছা আলোকে পূর্বজন্মের মত ছায়া ধরা লাগে, সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে  নিজেকে নিজের মত লাগে না আর।

টোটোর হর্নে ভঙ্গ হয় নির্জনতা।
টোটোম্যান হই হই করে চারজন কে চাপড়ামারি ফরেস্টে নিয়ে চলল, আগে থেকেই বাড়ির ভদ্রলোক বুকিং করে রেখেছিলেন, চাপড়ামারি হল সমস্ত ওয়াচ টাওয়ার্স গুলির মধ্যে সবচেয়ে নাকি দূরে।

খোলা মারুতির হাওয়ায় এফোঁড় ওফোঁড় হতে হতে চল্লাম। ড্রাইভার আর গাইড শুদ্ধু, গাইডকে দেখেই আমার বড় কন্যা হা হা করে উঠল, বল্ল "এ বাবা ইনি কি আমাদের হাতি গন্ডার দেখাবে নাকি! আমরা ছোটবেলা থেকে ছবি দেখছি তো চাঁপাডালির মোড়েও দেখেছি হাতি!!!"
ভদ্রলোক জানালো চুপ! এদের নিয়ে যাওয়া বাধ্যতা মূলক। ড্রাইভার ছেলেটি ভারি হাসিমুখের ট্রাইবাল, গোন্দ উপজাতির, হয়ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে চলে এসেছে এদিকে রুটি রুজির তাগিদে।

সে মহা উৎসাহে গল্প জুড়ে দিল, "চোখ কান খুলে রাখুন স্যার তাদের রাস্তায় পাবেন কিছু না কিছু", স্যার চাদরের আড়াল থেকে বলে উঠল, "যা ঠান্ডা! হাতি আমার গায়ে পা তুলে দিলেও তাকিয়ে থাকা পসিবল নয়।"

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বুঝতে পারল বিবিজিই তার বকবক ও গল্পের একমাত্র শ্রোতা। বাকিরা কিছু দেখা আর বলার মধ্যে এই ঠান্ডায় নেই! গাড়ি লাটাগুড়ি ছাড়িয়ে চাপড়ামারির দিকে চলল। চলার পথে পড়ল বিরাট বড় তিস্তা টি এস্টেট। চলছে তো চলছেই চা বাগানের সারি। গাড়ি ডান দিকে টার্ন নিতেই বনের ঘনত্ব বেড়ে গেল যেন। হঠাৎ ড্রাইভার বলে উঠল "বাঁদিকে তাকান বিবিজি, এটা লাভার রাস্তা"।

সে দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে স্তব্ধ হতে হয় --আস্তে আস্তে করে ঘুরে গেছে পথ, উপরে কালো মিশমিশে ভূটান পাহাড়, সেদিকে তাকালে মনে হয় ধোঁয়া উঠছে ভেতর থেকে। নানা রংবেরঙী ফুল, কি জানি আমার মনে হল শিমুল ফুল, অমলতাস ফুল ও ছিল, ঘন বনের বুক চিরে চিরে উঠছে পথ, সে পথ থেকে নেমে আসে ক্ষীণকায়া ঝোরা। এরা নাকি বর্ষাকালে নদীর মত চেহারা নেয়। বনের মধ্যে পাতার ফাঁকে ফাঁকে  নরম চিলবিলে রোদ এসে আরাম লাগছিল গায়ে। গাড়ি এগিয়ে যেতেই সামনে পড়ল নদী।
" ভাবিজি দেখুন দেখুন -- আপনার নদী এসে গেছে!"

নদী দেখে মুগ্ধা আমি কিছু বলার আগেই পাশের সিট থেকে ' আহা কি দারুণ' অবিকল আমার মত করে বলে উঠল ভদ্রলোক, পাশ থেকে দুটি গলা খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল অমনি। অপমানিত হয়ে আমি চুপ করে থাকলাম। বেহায়া ভদ্রলোক ড্রাইভারকে  বলল, "দিদিমনি খুব জঙ্গল নদী, চাঁদ, ইয়ে টিয়ে পছন্দ করে, দেখাও দেখাও"।
ড্রাইভার এবার গম্ভীর হয়ে বল্ল "দিনের বেলায় চাঁদ কোথায় পাবো বাবু?"

যাইহোক চাপড়ামারি ওয়াচ টাওয়ার-এ পৌঁছে মন জুড়িয়ে গেলো। শীতের ধাক্কায় যারা কাবু ছিলেন মনে হল তারা ঝাড়া তারা দিয়ে উঠলেন-- আমরা একেবারে ফরেস্ট বাংলো টাওয়ারের কাছে চলে গেলাম। অনেক দূরে কলকোলাহল মুক্ত জলাশয় তার চারধারে ঘন বনের সবুজাভ ছায়া সামনে সল্টবিট গুলিতে ওরা লবণ খেতে আসে। এখানেও লম্বা নলওয়ালা ক্যামেরার জ্বালায় জর্জরিত। জানিনা দেখার থেকে ধরে রাখাতেই কি বেশি আনন্দ!! অনেকেই জঙ্গলে যান বেড়াতে কিন্তু নিয়ম জানেন না, জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ থাকেt তার ভাষা হয়ত, চুপ করেই থাকতে হয় সেখানে।

ভিড়ে ভাল লাগছিল না, ওয়াচ টাওয়ারের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাব, ভদ্রলোক টেনে ধরলেন, বললেন "সিঁড়ি কাঠের, তাও ভাঙাt এখানে উঠে কি মরবে!!!"
আমিও জানি কি ভাবে ওনাকে বধ করতে হয়। একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যান করতে শুরু করলাম, "আমি যাব উপরে"।
কি আর করেন, সিঁড়ি দিয়ে তুলে নিয়ে এল দোতলায়। দেখলাম তিনতলার বেশ সিঁড়ি  আছে-- উপরে পালালাম। উনিও ছুটে উপরে উঠলেন --- উঠেই দুজনেই চুপ হয়ে গেলাম একসাথে। অসাধারণ! ছবির মত সুন্দর, অর্ধচন্দ্রাকৃতি এই পাহাড় জড়িয়ে আছে পরম মমতায়  জঙ্গলকে --নিবিড় সবুজ বন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আছে সবাই। সেই জলাশয়ে সাদা সুন্দরী বক, নাম না জানা মাছরাঙ্গার দল, কত পাখীর দল আর বন্যময়ূরে ভর্তি। আমার প্রফেশনাল ভদ্রলোকও বলে উঠলেন "ফ্যান্টাসটিক!"

একটু পরেই বন থেকে বেরোলো চিতল হরিণের দল। তাদের বাদামী রঙ চিকন ত্বক আর হাঁটার কায়দা দেখলে ক্যাটারিনা দীপিকাও লজ্জা পাবে। হাতি পেলাম না, বাইসন ছিল দু একটা।

হঠাৎ দেখলাম আমার বড়কন্যা উপস্থিত, সে জানালো কাঠের সিঁড়ি নয় ওয়াচ টাওয়ারের পেছনে লোহার সিঁড়ি দিয়ে সে এসেছে। এই মেয়েটির ভয় ডর বেশ কম, বাবার বকুনিতেও কথা শোনা নেই। স্লিপ চড়ার মত করে রেলিং দিয়ে নিচে নেমে গেল। আমি নিচে নেমে হাতির বড় বড় সেই বাতাবি লেবুর সাইজের পটি দেখে ছবি তুলতে যেতেই আবার সমবেত হাসি। ভদ্রলোক বলে উঠল "হেবি সার হয় এতে ব্রেনের। নিয়ে যাবে নাকি সাথে একতাল?"
আমি জলন্ত চোখে তাকাতেই ভদ্রলোক হাত ধরলেন, পাগল ত পাগলি ই, আবার হাসি তিনজনের!

হাতি দেখা হয়েছিল শেষ পর্যন্ত, হাতি চাপড়ামারি, গোরুমারা জলদাপাড়া কিছুতেই যখন এলো না, বাড়ির কর্তা খুব বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন দূর, বাজে সময় নষ্ট হল, লাভা চলে গেলেই হতো। তার সাথে তার দুই কন্যাও সহমত হলো, তারা জানে মায়েরই জঙ্গল প্রেম অনন্ত, আমি অপরাধীর মত সব গুছোচ্ছি পরের দিন বাগডোগরা পৌছতে হবে।

মধ্য রাতে আন্দাজ আড়াইটা, ঘরের জোরে জোরে নক করার শব্দ। হুড়মুড় করে উঠতেই বলল, "স্যার, আমি রুম বয়। বাংলোর সামনে হাতি এসেছে, দেখবেন তো তাড়াতাড়ি আসুন।" কি বলব, ওই শীতের রাত, তার মধ্যে আমি প্রায় জ্ঞানশূন্য হয়ে কম্বল ছেড়ে নাইটড্রেসের উপর চাদর নিয়ে ছুট। বাড়ির ভদ্রলোকটি উলিকটের গেঞ্জির উপর চাদর চড়িয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে ছুটলেন, বড় মেয়ে চোখ খুলে সব শুনে চোখ বন্ধ করে বলল, "তোমরা পারো বটে!" ছোট কে ওঠানোই গেল না।

নিচে নেমে সামনে এসে দেখি বাংলোর হাতার সামনে রাখা গাড়ির কাছে নেপালী ড্রাইভাররা ওদের ভাষায় কিচমিচ করছে, জানা গেলো হাতি ধানক্ষেতের দিকে এগিয়ে গেছে, বাংলোর হাতার গাছ তুলবার চেষ্টা করছিল, তারা দেখেছে তখন। আবার দৌড়, অনেকেই নিচে নেমে এসেছেন হাতি দেখবেন বলে। কিছুটা দূরে মোড় ঘুরতেই দেখি মিশকালো বৃহদাকার তিনি দাঁড়িয়ে, আমাদের মোড়ের পরের মোড়েই। লোকের হাঁকডাকের চোটে মুখ ঘুরিয়ে গলির মুখ ছেড়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। তার ই মধ্যে অন্ধকারেই ছবি তোলার জন্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেল।

পরের দৃশ্য ছিল ভয়ঙ্কর। যেই মোড়ে হাতি হারিয়ে গেল, সেই মোড়ের আগের মুখ থেকেই শুনি মা মা ডাক। ভগবান! আমার বড় কন্যা ছুটে আসছে। দেখতে পেয়ে আমি বোধহয় পড়েই যেতাম মাটিতে, বাকিরাও হৈ হৈ করে ঊঠল-- তার বাবা প্রচন্ড রেগে বলল, "তুই ওই দিক থেকে কি করে এলি? ওখানে এই মাত্র হাতি ছিল, তোকে যদি দেখতে পেত!"
মেয়ে অম্লানবদনে বলল, "চিল বাবা চিল, এটা শর্ট কার্ট তো, তাই এদিক থেকে এলাম। হাতি আর আমার চেহারা দেখেছ!! হাতির চোখও ছোট, আমি হাতির পা ধরে চললেও হাতি মশা ভেবে নেবে। উফফফফ তোমরা ফালতু ফালতু চেঁচাচ্ছ।"
বাবা হাল ছেড়ে দিল। সবাই ইতিমধ্যে আবার হাতি হাতি করে আঙ্গুল তুলতেই দেখি মহারাজ দণ্ডায়মান।

ঘরে এসে দরজা খুলতেই ছোট মেয়ে বড় মেয়ের উপর ঝাঁপালো ওকে একা রেখে গেছিল বলে।  বাবা গম্ভীর হয়ে বলল, "ভ্যাগিস তোকে নিয়ে যাই নি। হাতিটা নাকি তার বাচ্ছা খুঁজতে বেরিয়েছে! যদি তোকে ভুল করে নিয়ে যেতো?"

আবার মাঝরাতে চেঁচামেচি মারামারি শুরু হয়ে গেলো।

শুভশ্রী_সাহা

Comments

Popular posts from this blog

আমার বাবা - আমার ছেলেবেলা

                                            দেখতে দেখতে তেইশটা বছর পেরিয়ে গেল – বাবাকে দেখিনি, গল্প করিনি, বাবার আদরের ছোঁয়া পাইনি…… বাবার কথা বলতে গিয়েই প্রথমে মনে পড়ে তাঁর মিষ্টি হাসিটা। আমার বাবা ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। আমার কখনো মনে পড়েনা যে বাবা আমাকে জোর গলায় কিছু বলেছেন বা বকেছেন। ছোটবেলায় আমি আর আমার বোন সঞ্চারী বাবার কাজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতাম – কেন না বাবা ফিরে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ভূতের গল্প শোনাবেন সেই আশায়! কী যে মজার দিন ছিল সেই সব... ছোটবেলায় আমার শখ ছিল পুতুল নিয়ে খেলার, খুব ভালবাসতাম। মনে পড়ে একবার বাবা আর মা বিদেশ থেকে ফেরার  সময় একটা Walkie Talkie Doll (পুতুল) নিয়ে এসেছিলেন। আমি  সেই পুতুলটিকে নিয়ে সারাদিন খেলতাম। একদিন একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে এসেছিল আমাদের বাড়িতে তার বাবামায়ের সাথে আর ওর –ও ঐ পুতুলটিকে খুব ভালো লেগে গেল। আমার নরম মনের বাবা আমাকে বললেন ‘মানা তুমি ওই বাচ্চাটিকে তোমার এই পুতুলটি দিয়ে দাও, আমি তোমাকে আবার...

আমরা তো হেমন্তই হতে চাইতাম

আজও বিকেলে মাঝে মাঝে খুব হেমন্ত শুনতে ইচ্ছে হয়..... "কোনোদিন বলাকারা এতো দূরে যেত কি "...... কিংবা "ওলির কথা শুনে বকুল হাসে ".......আজও মনে পরে "বিষ্ণুপ্রিয়া গো আমি চলে যাই ".......বা "সারাটি দিন ধরে / চেয়ে আছিস ওরে /তোর মনে কথা তবুও কেউ জানলো  না"......আকাশে মেঘ করলেই মনে পরে "মেঘের স্বপন দেখি "......শুধু একজনের জন্য।...... হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । কখনো আবার বেশি রাতে আজও  শুনি বিবিধ ভারতীতে.... "তেরি দুনিয়া মে জিনিসে /তো বেহতর হ্যায় / কে মর যায়ে ".....আর সাথে যদি হয় 'ছুঁপালো যুঁ দিল মে প্যার মেরা " ...তাহলে তো কথাই নেই।   বাবাদের ছেলেবেলায় খুব প্রিয় ছিল " শূর্পনখার নাক কাটা যায় / উই কাটে বই চমত্কার / খদ্দের কে জ্যান্ত ধরে / গলা কাটে দোকানদার "........ মা এখনও  শুনতে চায় "ঘুম যায় ওই চাঁদ মেঘ পরীদের সাথে "......জ্যাঠার ঘরে বসে কত দুপুর কেটেছে শুধু "বসে আছি পথ চেয়ে"........ সেই কোন ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি "যদি জানতে চাও তুমি / এব্যাথা আমার কত টুকু / তবে বন্দি করা কোনো পাখির কাছে জেনে ...

একই সুরে কত গান

বিষয়টা খুব একটা নতুন নয়।  যদিও বেশ আকর্ষণীয়।  গান আমরা প্রায় সকলেই শুনি।  এবং এও জানি যে এমন গান আছে যা শুনলে হঠাৎ করে মনে হয় "আরে   এই গানটার  একটা হিন্দি আছে না?" বা " এই গানটার বাংলা টা  যেন কি?"  এবং এই গানগুলির বিষয়ে মানুষের এক-ধরণের স্বভাবজাত আকর্ষণ ও আছে।  তাই ভাবলাম দেখি কিছু লেখা যায় কিনা।  মজার ব্যাপার সব গান নিয়ে লেখা খুব একটা সহজ নয়।  তবুও চেষ্টা করে দেখতে গেলে ক্ষতি কি।     প্রথমেই আসা যাক সলিল চৌধুরীর গান -এ।  তিনিই এই কাজ প্রথম শুরু করেন বলেই মনে হয়।  না ভুল হলো তার আগে শচীন কর্তাও আছেন।  তবে আগে সলিল চৌধুরীকে  নিয়েই হোক।  লতাজিকে দিয়ে তিনি ৩৫টি বাংলা  আধুনিক  গান গাইয়ে  ছিলেন।  যার ২৯ খানারই অন্য ভার্সন আছে।  ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " গানটির  হিন্দি  ছিল ১৯৬১ সালে প্রকাশিত "মায়া" হিন্দি ছবির " যারে যারে উড় যারে পঞ্চী " . "যারে যারে উড়ে যারে পাখি " এর উল্টো দিকে ছিল " না যেও না" যার হিন্দি ছিল ১৯৬০ সালে...